Tuesday, 26 February 2013

মানসিক রোগ -সিজোফ্রেনিয়া



মানুষের মানসিক অসুস্খতা বা মানসিক ব্যাধি প্রকৃতি অনুসারে দুই জাতের হতে পারে। এদের কতক মৃদু মাত্রার আবার কতক তীব্র মাত্রার। সিজোফেন্সনিয়া একটি তীব্র মাত্রার জটিল মানসিক ব্যাধি।
এটিকে এক-দু লাইনে সংজ্ঞায়িত করতে মেডিকেল গবেষকরা পর্যন্ত হিমশিম খেয়ে যান। তাই সিজোফেন্সনিয়াকে সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপারটিকে অনেকে কৌশলে এড়িয়ে চলেন। এ তীব্র জটিল মানসিক অসুখটিতে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপ যথেষ্ট বিঘিíত হয়, যাতে করে সিজোফেন্সনিকরা তাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে ও তাদের দৈনন্দিন ব্যক্তিজীবনে পর্যন্ত বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এদের চিন্তা, চেতনা,
অনুভূতি, কাজকর্ম বাস্তবতার সাথে কেমন যেন খাপছাড়া। সিজোফেন্সনিকরা নিজস্ব মনোজগত ভুবন তৈরি করে নেয়, যার মাঝে বাস্তবতার লেশমাত্র নেই। বাস্তবতার সাথে তাদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি আর বোধশক্তির এত বেশি ফারাকের জন্যই এটিকে আমরা সাইকোসিস বলে থাকি। সাইকোটিক রোগীরা তারা নিজেরা যে অসুস্খ সেটি পর্যন্ত বুঝতে পারে না।
খুব জনপ্রিয় একটি বইয়ের কথা বলছি। বইটির নাম হলো ‘দি ব্রোকেন ব্রেন’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ভাঙা  মস্তিষ্ক বা যে মস্তিষ্ক অনেকগুলো টুকরোতে বিভক্ত। সিজোফেন্সনিয়াতে আসলে মানব মন মস্তিষ্ক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ডা. ন্যান্সি অ্যানড্রেমন অবশ্য বলেন যে, সিজোফেন্সনিয়ার জন্য কোনো একক কারণ দায়ী নয় বরং এ অসুখটি বিকাশের জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর বা কারণ দায়ী। এতে ব্রেনের বা মস্তিষ্ক গঠনেও পরিবর্তন লক্ষণীয়। এটি বিকাশের পশ্চাতে বংশগত বা জেনেটিক কারণকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। 

এমনকি ভাইরাসজনিত ইনফেকশন বা ভাইরাল সংক্রমণ অথবা মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে যে সিজোফেন্সনিয়া হবে না এমনটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। একটি শারীরিক অসুখের জন্য মানসিক সমস্যা হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞান খুব সুন্দরভাবে বর্তমানে গ্রহণ করেছে।

মানব মস্তিষ্কে নিউরন বা স্নায়ুকোষের পরিমাণ অনির্দিষ্ট, এ সংখ্যাটি বিলিয়ন বিলিয়ন হতে পারে। প্রত্যেকটি স্নায়ু বা নিউরনের শাখা-প্রশাখা থাকে যার সাহায্যে সে অন্য স্নায়ু বা মাংসপেশি বা অন্য কোনো গ্রন্থি থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করতে পারে। নিউরন বা স্নায়ুকোষের শেষাংশে বা টার্মিনাল থেকে কতক রাসায়নিক পদার্থ নি:সৃত হয়। এগুলোকে নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক দূত বলা হয়ে থাকে। এগুলোর সাহায্যে মূলত নানা ধরনের উদ্দীপনা স্নায়ুকোষ থেকে স্নায়ুকোষে পরিবাহিত হয়। সিজোফেন্সনিয়া রোগটিতে ওপরে আমরা যে যোগাযোগব্যবস্খার কথা বললাম সেটি মারাত্মকভাবে বিঘিíত হয়।

আসুন মানব মস্তিষ্ককে আমরা টেলিফোন সুইচ বোর্ডের সাথে তুলনা করে সিজোফেন্সনিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট একটি ধারণ নেয়ার চেষ্টা করি। সুস্খ মস্তিষ্কের সুইচিং সিস্টেম খুব ভালো কাজ করে। এতে নানান ধরনের সংবেদী তাড়না বা খবর আসে এগুলো কোনো রকম তথ্য ঢোকায়। ব্রেনে বা মস্তিষ্কে তথ্যসমূহের সঠিক প্রক্রিয়াজাত হয়ে থাকে­ফলে ব্যক্তির চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি ও সার্বিক কার্যাবলি সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়। এবার আসি যারা সিজোফেন্সনিক তাদের নিয়ে। এদের নিউরনের যোগাযোগব্যবস্খায় গণ্ডগোল থাকে, ফলে তার প্রভাব পড়ে মানসিকভাবে অসুস্খ রোগীর চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি ও তার কাজকর্মে বা আচরণে। এদের প্রত্যক্ষণ বা পারসেপশন ও বোধশক্তি হয় বিঘিíত। চিন্তা-ভাবনাগুলো যেন মস্তিষ্কে উল্টা-পাল্টা খেলায় মেতে ওঠে। কখনো এগুলো মস্তিষ্কে ঠাসাঠাসিভাবে ট্রাফিক জ্যামের মতো জ্যাম সৃষ্টি করে অর্থাৎ তাদের আচরণ ভুল গন্তব্যের দিকে মোড় নেয়।

সিজোফেন্সনিয়া অনেক সময় এত ধীরে ধীরে বিকশিত হয় যে, পরিবারের সদস্য বা রোগী নিজেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন না যে, তিনি এক ভয়াবহ মানসিক ব্যাধিতে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের সিজোফেন্সনিয়াকে আমরা বলি ইনসিডিয়াল সিজোফেন্সনিয়া। হঠাৎ করে যদি সিজোফেন্সনিয়া হয়ে যায় এবং উপসর্গগুলো স্পষ্ট থাকে তবে তাকে একিউট বা ক্রাইসিস সিজোফেন্সনিয়া বলে। একিউট বা হঠাৎ করে যে সিজোফেন্সনিয়া হয় তা সাধারণত তীব্রমাত্রাসম্পন্ন হয়ে থাকে। এতে হ্যালুসিনেশন বা অলীক প্রত্যক্ষণ, ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস, চিন্তন পদ্ধতিতে গণ্ডগোল ও নিজের সম্পর্কে অস্তিত্ববোধ বা নিজস্ব অনুভূতিবোধ বিকৃত হয়ে যেতে পারে। সিজোফেন্সনিক রোগীদের লক্ষণ ও উপসর্গ কতক ক্ষেত্রে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এ সময় এদের আচরণজনিত নাটকীয় পরিবর্তন সম্পন্ন হয়ে থাকে। অনেকের আবার জীবনব্যাপী এ ধরনের ছোটখাটো নাটকীয় আচরণ বা অস্বাভাবিক আচরণ কয়েকবার হয়ে থাকে। পরপর দুটি এপিসোড বা অ্যাটাক হওয়ার মাঝখানে তারা আবার মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে থাকে। অনেকে আবার এ সময়ে সব বিষয়ে অনীহায় ভোগে, অবসন্ন বা বিষণí থাকে, স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে না।

একটু আগেই বলেছি ক্রনিক সিজোফেন্সনিয়া বা দীর্ঘমেয়াদি সিজোফেন্সনিয়ার কথা। এটিও অনেক ক্ষেত্রে তীব্রমাত্রা, রোগীকে দীর্ঘদিনের অক্ষমতায় ভোগায়। এতে রোগী সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, এদের প্রেষণার মারাত্মক ঘাটতি থাকে, বিষণíতা বা দীর্ঘমেয়াদি অবসন্নতাবোধ থাকতে পারে এবং এদের আবেগ ভোঁতা থাকে বা কতক ক্ষেত্রে আবেগের স্খূলতা থাকে। সাথে ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ডিলিউশন এবং চিন্তা করাতে বা চিন্তনপ্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্যতা থাকতে পারে।
সিজোফেন্সনিয়ার উপসর্গ হ্যালুসিনেশন বা অলীক শ্রবণ
সিজোফেন্সনিয়া রোগীদের অনুভূতি বা ইন্দ্রিয় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শাণিত ও তীক্ষîরূপ ধারণ করে। যেসব তথ্য পঞ্চইন্দ্রিয়ের সাহায্যে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, মস্তিষ্কে এক্ষেত্রে সেসব তথ্যকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা করতে পারে না। তাই এসব তথ্যের তাড়নায় ব্যক্তি যে সাড়া দেয় তা থাকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অসংলগ্ন। সিজোফেন্সনিকরা এমন কথাবার্তা শুনতে পান যে, তাকে বলা হচ্ছে ‘তুমি এটা কর ওটা কর’। অথচ আশপাশে কেউ নেই বা আশপাশে কেউ থাকলেও তারা কিন্তু কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। এ অলীক বা গায়েবি আওয়াজকে বলা হয় ‘অডিটরি হ্যালুসিনেশন’। একজন সিজোফেন্সনিকের উদাহরণ দিচ্ছি­ তিনি বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলেন পথের মাঝে চলন্ত বাসে তার কানে গায়েবি আওয়াজ আসতে শুরু করল এবং তা তার কানে বলল ‘তুই এক্ষণি বাস থেকে নেমে যা’। যেই শোনা সেই কাজ­তৎক্ষণাৎ সিজোফেন্সনিক রোগীটি চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়ল। পরে সে যখন আবার সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করল তখন দেখা গেল তার ক্ষতবিক্ষত চেহারা অর্থাৎ সিজোফেন্সনিকরা কানে যা শোনে তা বিশ্বাস করে ও সাথে সাথে মানে। তবে কতক ক্ষেত্রে সিজোফেন্সনিকরা যে অডিটরি হ্যালুসিনেশনে ভোগে তাতে তারা আশ্বস্ত হওয়ার বা নিরপেক্ষ কোনো শব্দ শুনে থাকে। কতক আবার চোখেও এমন জিনিস দেখে যা অন্যরা দেখে না।
ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস
সিজোফেন্সনিকদের অস্বাভাবিক বিশ্বাস থাকতে পারে। এতে তারা তাদের বিশ্বাসগুলোতে সব সময় অবিচল থাকে­বিশ্বাসগুলো ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও কালচারাল বা সংস্কৃতিগত এবং শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী, তথাপি রোগী এতে বিশ্বাস স্খাপন করে। যাদের সিজোফেন্সনিয়া আছে তারা লাল-সবুজ ট্রাফিক সিগন্যালকে আদেশ বা নির্দেশ মনে করতে পারে। অনেক সিজোফেন্সনিক রয়েছে যারা বিশ্বাস করে তাদের বিরুদ্ধে অন্যরা সমালোচনা বা ষড়যন্ত্র করে চলেছে। মনে করে কেউ তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা লেলিয়ে দিয়ে দূর থেকে তার কাজকর্মকে দেখছে। সিজোফেন্সনিয়ার এ ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ধারণাটি প্রবলমাত্রায় থাকে, একে বলে প্যারানয়েড। সহজ বাংলায় সন্দেহবাতিকতা যা স্বাভাবিক সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। অনেকে আবার বলে থাকে যে, তাদের চিন্তা-চেতনা ও মনের কথাগুলো কেউ চুরি করে নিয়ে রেডিও, টেলিভিশন বা সিনেমায় প্রচার করছে। তারা এ রকমও বলে যে, বাইরের কোনো শক্তি তাদের চিন্তা-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
চিন্তায় গণ্ডগোল বা অসংলগ্ন চিন্তাধারা
সিজোফেন্সনিকরা তাদের চিন্তা-ভাবনাকে গোছগাছভাবে বা সমন্বিত রাখতে পারে না­প্রায়শ তাদের চিন্তা-ভাবনার ধরন থাকে বিক্ষিপ্ত। অনেক সিজোফেন্সনিকের কথাবার্তার পেছনে কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। হঠাৎ করে মাথায় উল্টা-পাল্টা চিন্তা আসে আবার বোঝার আগেই হুটহাট করে চিন্তাগুলো হারিয়ে পুরো মাথা একদম ফাঁকা হয়ে যায়। যেহেতু তাদের চিন্তন পদ্ধতির কাঠামো অসংলগ্ন বা বিশৃঙ্খলতায় পরিপূর্ণ, তাই তাদের কথাবার্তাও প্রায় সময়ই অসংলগ্ন ও অযৌক্তিক থাকে। তাই দেখা যায় এদের আবেগজনিত প্রকাশ ও সত্যিকার পরিস্খিতি অনেকাংশে খাপ খায় না। যেমন যেখানে হাসা দরকার সেখানে এরা কেঁদে ফেলে এবং উল্টোটাও ঠিক।
নিজ সম্পর্কে নিজস্ব ভাবনা
সিজোফেন্সনিকরা অনেকাংশে নিজের আমিত্বের অনুভূতিটি বুঝতে পারে না। নিজেকে অর্থাৎ নিজ সম্পর্কে নিজস্ব অনুভূতির বিলুপ্তি ঘটে। কতক ক্ষেত্রে তারা মনে করে বা চিন্তা করে তাদের দেহ বা শরীর নিজ থেকে আলাদা বা ব্যক্তি থেকে আলাদা।
প্রেষণার অভাব বা অ্যাপাথি
সিজোফেন্সনিকরা তাদের নিজের ভেতরের শক্তি হারিয়ে ফেলে, জীবন সম্পর্কে উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে। এটিকে আমরা অনেকে অলসতা বা খামখেয়ালি বলে ভুল করে থাকি। সিজোফেন্সনিয়াতে মানসিক রোগী তার মনের শক্তি এতটাই হারিয়ে ফেলে যে, তারা অনেক সময় কেবলি ঘুমাতে চায়। খাওয়া-দাওয়ার সময় উঠে অগোছালোভাবে খাওয়া-দাওয়া করে। নিজের প্রতি কোনো যত্ন তারা কখনো নেয় না। দেখা যায় যে, এদের কাপড়-চোপড়ে ঝোলের দাগ, দাড়ি-মোচ গজিয়ে একেবারে দরবেশ হয়ে গেছে। আঙুলের নখ অনেক বড় হয়ে তাতে ময়লা জমেছে। এক কথায় জীবন সম্পর্কে কোনো উৎসাহবোধ তাদের থাকে না।
ভোঁতা বা আবেগহীন অনুভূতি
সিজোফেন্সনিকদের আবেগ, অনুভূতিতে কতক পরিবর্তন আসে। চোখ-মুখে আবেগের তেমন কোনো প্রকাশ স্পষ্ট নয়। কেমন যেন মেঘাচ্ছন্ন ভাব। তাদের শরীরের নানা অংশের নড়াচড়াও সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই আবেগ এতটাই অবদমিত থাকে যে, বিশেষ পরিস্খিতিতে পর্যন্ত তারা আবেগশূন্যতায় ভোগে। তবে তার মানে কিন্তু এই নয় যে, ব্যক্তির আবেগ অনুভবের ক্ষমতা একেবারেই নেই। অনেক ক্ষেত্রে সিজোফেন্সনিকরা ভেতরে ভেতরে তীব্র আবেগ অনুভব করে। কিন্তু তা বাইরে প্রকাশ করলেই যত সমস্যা। সিজোফেন্সনিয়ার প্রাবল্য যত বাড়ে আবেগহীনতাও তত সামনের দিকে অগ্রসর হয়।
বিষণíতা
সিজোফেন্সনিয়ার সাথে বিষণíতা বা দীর্ঘমেয়াদি মাঝারি থেকে তীব্র অবসন্নতা বা দু:খবোধ থাকতে পারে। এ সময় রোগী নিজেকে খুব অসহায় ও আশাহত মনে করে। সিজোফেন্সনিয়ার সাথে সমন্বিত হয়ে এ সমস্যাটি থাকলে তা ব্যক্তির জীবনধারায় বিপুল নেতিবাচক পরিবর্তন সাধন করে। এতে রোগীর একান্ত নিজস্ব কিছু চিন্তা-ভাবনার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সময় অনেকে মনে করে যে, সবাই তার সাথে খারাপ আচরণ করে, তাদের সাথে কেউ সুন্দর সম্পর্ক রাখতে চায় না বা কেউ তাদের ভালোবাসে না। বিষণíতাজনিত উপসর্গসমূহ অত্যন্ত বেদনাদায়ক, এগুলো কথার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে অথবা কেউ কেউ আত্মহত্যা বা সুইসাইড পর্যন্ত করে ফেলতে পারে। এ সময় মস্তিষ্কে যে জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তার জন্য রোগীকে ওষুধ অবশ্যই সেবন করানো উচিত।
সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া
সিজোফেন্সনিয়াতে যারা অনেক দিন যাবৎ ভোগে তারা ক্রমশ সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিজস্ব মনের ছোট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ভুবনে থাকতে পছন্দ করে। এটি অবসন্নতা বা বিষণíভাবের জন্য হতে পারে অথবা একা থাকাটাই নিরাপদ­এ রকম ভ্রান্ত ধারণার কারণেও হতে পারে। সমাজে বসবাসের জন্য আচরণগত যেসব দিক থাকা দরকার তা অনেক সিজোফেন্সনিকের থাকে না।

যাদের বয়স ২৫-৩০-এর মাঝে তারা সিজোফেন্সনিয়ায় জীবনে প্রথমবার বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। অবশ্য বয়স ৪০-এর ওপরে গেলেও সিজোফেন্সনিয়া হতে পারে। এ মানসিক অসুস্খতা সব জাতিতে, সব কালচার বা সংস্কৃতিমনা মানুষের, সমাজের যে কোনো শ্রেণীর মানুষের বা নারী-পুরুষ সবার হতে পারে। তবে নানা গবেষণা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, শতকরা ১ জন লোক সিজোফেন্সনিয়াতে আক্রান্ত। সে হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় ১৩ লক্ষ লোক সিজোফেন্সনিয়া রোগে আক্রান্ত। সিজোফেন্সনিয়া সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য না হলেও অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগ বা সাইকোসিসবিরোধী ওষুধ সেবনে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো অনেকাংশে কমে যায়। তাই সিজোফেন্সনিকরা ঠিকমতো ওষুধ সেবন করে ও সাথে সাইকোথেরাপি নিয়ে বেশ সুস্খ থেকে সমাজের আর ১০টা মানুষের মতো সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।
সামাজিক অপবাদ ও সিজোফেন্সনিয়া
সব দেশে, সব সমাজে সিজোফেন্সনিকদের অপবাদ বা মিথ্যা নিন্দা করা হয়ে থাকে। এদের অনেকে বলে ‘পাগল’। অথচ আপনি জানেন কি তাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করা একটি সামাজিক অপরাধ। এতে করে আপনি তাকে সামাজিকভাবে অপদস্খ করে আরো পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আপনার এ অপরাধের দায়ভার কে নেবে? আশপাশে একটু নজর দিন­রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঘুরে রাস্তাতেই থাকে। কখনো উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ তাকে দেখতে পাওয়া যায়। এদের আপনারা অনেকে বলছেন ‘পাগল’। অথচ বলা উচিত ছিল মানসিকভাবে অসুস্খ। সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি­ রাস্তার যে লোকটিকে আপনি পাগল বলে গাল দিচ্ছেন, সে হয়তো কয়েক মাস আগেও ঠিক আপনার মতো স্বাভাবিক সুস্খ মানুষ ছিল। আমি বা আপনি যে কখনো এ জটিল মানসিক ব্যাধিতে ভুগব না বা কখনোই আক্রান্ত হব না এমনটি ভাবলে বুঝবেন আপনার মানসিক অসুখ নিয়ে পূর্ব ধারণা নেই। তাই তাকে অপরাধ বা নিন্দা না করে বরং আদর, সোহাগ, ভালোবাসা ও সহযোগিতা দিয়ে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করুন। যেসব পরিবারে সিজোফেন্সনিয়ার রোগী থাকে, আমাদের সমাজে সেসব পরিবারের ভোগান্তির সীমা থাকে না। সিজোফেন্সনিয়া রোগটি সম্পর্কে লোকজনের মাঝে হাজারো ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। সিজোফেন্সনিয়া এমন একটি মানসিক ব্যাধি যাকে ঠিক পুরোপুরি বোঝা যায় না এবং অনেকেই এটি নিয়ে বেশ ভীতিতে ভোগেন। বেশির ভাগ লোক সিজোফেন্সনিয়া সম্পর্কে যে চিন্তা বা ধারণা করে তা আসলে অন্ধকারাচ্ছন্ন। অনেক লোক রয়েছেন যাদের ব্যক্তিত্ব ভাঙা বা দ্বিধাবিভক্ত। অনেকে আবার বহুমুখী পার্সোনালিটি বহন করে। সাধারণ লোকজন প্রায়শ সিজোফেন্সনিয়াকে আগের ভিন্ন দুটি অবস্খার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। অনেকের আবার এ রকম বিশ্বাস আছে যে, সিজোফেন্সনিয়ার রোগীরা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারাত্মক হিংস্র। অনেক সময় টেলিভিশনে দেখানো হয় যে, তীব্র মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে এ রকম রোগী অন্যকে ধরে মারধর করে। আমরা এ ধরনের ভ্রান্ত প্রচারণা বন্ধ রাখার জোর দাবি জানাই। এ ধরনের প্রচারণায় সাধারণ জনমনে মানসিক রোগ বা অসুস্খতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা জন্মে যে, মানসিক রোগ মানেই হচ্ছে ‘পাগলামি’। অথচ এ ধারণাটা কতটা যে অমূলক তা এ প্রবন্ধ পাঠে আশা করি বুঝতে পারবেন। হাতে গোনা কতক সিজোফেন্সনিক আক্রমণাত্মক বা মারমুখী হতে পারে, যে সংখ্যাকে বাদ দেয়া চলে।

সিজোফেন্সনিয়া অসুখটি একেকজন রোগীর জীবনে অনেকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো অত্যন্ত ব্যাপক এবং সাইকোটিক অবস্খায় রোগী এত বেশি দ্বিধান্বিত থাকেন যে সাধারণ লোকজন ভেবেই বসেন যে, এ রোগ কখনো ভালো হবে না। কতক লোকের আবার ধারণা, সিজোফেন্সনিকরা দুর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং তারা ভান করে বা লোক দেখানো পাগলামি করে থাকে বাড়তি সুবিধা আদায়ের জন্য। এসব ভ্রান্ত ধারণা। অনেকে আবার ভেবে বসেন যে, এটি পূর্বপুরুষের পাপের ফসল। কতক লোক আবার মনে করেন যে, শৈশবকালে আঘাত বা ট্রমা হওয়ার কারণে সিজোফেন্সনিয়া হয়ে থাকে। অনেকে ধারণা করেন যে, সিজোফেন্সনিয়া রোগটি অপশক্তির প্রভাবে হয়ে থাকে, আল্লাহর এক ধরনের শাস্তি হিসেবে চিন্তা করে থাকে।
সুইডেনের মনোচিকিৎসক ইউজেন ব্লিউলার ১৯১১ সালে সিজোফেন্সনিয়া শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। শব্দটি এসেছে মূলত গ্রিক ভাষা থেকে। এর প্রথম অংশটিকে বলা হয় ‘সাইজো’ বা ‘সিজো’, যার অর্থ ভাঙা বা টুকরো। দ্বিতীয় অংশ হলো ‘ফেন্সনিয়া’ অর্থাৎ মন। কাজেই সিজোফেন্সনিয়ার পুরো শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় ভাঙা মন বা যে মন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মনোচিকিৎসক ব্লিউলার যে অর্থে সিজোকে নিয়েছিলেন তার মূল ভিত্তি ছিল আমরা যা অনুভব করি, আমাদের বোধশক্তি এবং বাস্তবতা। এখানটাতেই সিজোফেন্সনিকদের গণ্ডগোলটা হয়। তারা অনুভূতি বোধশক্তি বা বাস্তবতাবর্জিত চিন্তা নিয়ে কাটাতে চায়। ডা. ব্লিউলার কখনো বলেননি যে সিজোফেন্সনিয়া মানে পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব দ্বিধাবিভক্ত হওয়া। অথচ পরবর্তীতে অনেকেই ধরে নিয়েছেন যে, এ অসুখটিতে ব্যক্তিত্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে অথবা বহুমুখী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। তাই অনেক সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোচিকিৎসকের সামাজিক অপবাদ বেড়েছে, অসুখটি নিয়ে কুসংস্কার বা ভ্রান্ত ধারণার জন্ম নেয়া সহজ হয়েছে। যে কথাগুলো এখানে উল্লেখ করলাম সেগুলো সিজোফেন্সনিক পরিবার তো বটেই­ যাদের পরিবারে কোনো মানসিক অসুস্খতা নেই তাদেরও জানা উচিত বলে আমি মনে করি।

ওপরের ধারণার সাথে নতুন আরেকটা ধারণা এসে জন্মেছে­ সেটি অতীতের কোনো পাপ বা অন্যায়বোধ। অতীতে পাপ করলে তার জন্য পরবর্তীতে সিজোফেন্সনিয়া হবে তা কেবল কুসংস্করাচ্ছন্ন নয়­হাস্যকর ও সম্পূর্ণ যুক্তিহীন এবং বানোয়াটও বটে।

১৮০০ সালের শেষদিক থেকে এ শতাব্দীর শুরুতে সাইকিয়াট্রিস্টরা সিজোফেন্সনিয়াকে নানা আঙ্গিকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জানার চেষ্টা করেছেন। জার্মানের গবেষক ডা. ইমিল ক্রাপলিন গবেষণা করেছেন সিজোফেন্সনিয়ার জীব বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে। অস্ট্রিয়াতে মনোবিজ্ঞানী ফন্সয়েড ও তার দল গবেষণা করেছেন মনোবিশ্লেষণ বা সাইকোঅ্যানালাইসিস নিয়ে। তারা অবশ্য মৃদু মানসিক রোগ যেমন নিউরোসিস নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়েছেন। আমেরিকার জন বি ওয়াটসন মানব আচরণ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করেছেন। পরবর্তীতে ইমিল ক্রাপলিনের গবেষণা ইউরোপে যথেষ্ট বিস্তার লাভ করে এবং মনোবিশ্লেষণ ও আচরণজনিত গবেষণা বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে আমেরিকাতে।

১৯৫০ সালের দিকে আমেরিকার সাইকিয়াট্রিস্টরা মনে করতেন যে, সিজোফেন্সনিয়া আসলে জীবনের একেবারে প্রারম্ভে পিতা-মাতা কর্তৃক সন্তানে সাইকোলজিক্যাল ট্রমা বা মানসিক আঘাতের কারণে হয়ে থাকে। যাদের মায়েরা সিজোফেন্সনিক ছিল, গবেষণায় দেখা গেছে তারা অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা অ্যাংজাইটি এবং অবসেশন বা শুচিবায়ুতেও ভুগছিলেন। এসব নারীকে বলা হয়েছিল সিজোফেন্সনিজেনিক। এসব পরিবারে যে সন্তান জন্ম নেয় তাদের পরবর্তীতে সিজোফেন্সনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। তারা জন্মের পর থেকে পিতা বা মাতার এসব আচরণকে অনুকরণ করে, মনে করে এগুলোই বুঝি স্বাভাবিক আচরণ। নিজের অজান্তেই এক সময় তারা এতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আমেরিকার সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোঅ্যানালিস্ট বা মনোবিশ্লেষক মনে করেন যে, সিজোফেন্সনিয়া হলো কতক আচরণগত অসামঞ্জস্যতা, কোনো পৃথক অসুখ বা রোগ নয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্য থেকে সূত্রগুলো বিবৃত হলো। সিজোফেন্সনিকদের কেবল সামাজিকভাবে অপদস্খ করা হয় না বরং এ জটিল মানসিক ব্যাধির উপসর্গগুলোকে পর্যন্ত কলঙ্ক দিয়ে লেপটে দেয়া হয়। যে পরিবারে মানসিক অসুস্খতা আছে তারা তা যেভাবেই হোক লুকিয়ে রাখতে চায়।
মন-মস্তিষ্কে গণ্ডগোল শুরু : কীভাবে বুঝবেন
মানসিক সমস্যা বা মানসিক ব্যাধি সাধারণত ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। এ বিকাশধারাটি এত ধীরে আর নিভৃতে হতে পারে যে, আপনি বুঝতেই পারবেন না কখন মানসিক অসুস্খতার শিকার হয়ে গেছেন। পরিবারের কথায় আসি। পরিবারের কোনো সদস্য সবার অজ্ঞাতে ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যায় পড়তে পড়তে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ল। পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন করলে তারা বলেন আমরা বুঝতেই পারিনি কীভাবে সে মানসিক পীড়াগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা এখনো বলেন যে, আমরা তো দেখেছি তার সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। আসলে কি জানেন এই সবকিছু বলতে আমি-আপনি যা বুঝি তাই হয়তো সব নয়। মানুষের মন-মননশীলতার বিস্তৃতি অনেক ব্যাপক। তারা হয়তো এমনটি বলে থাকেন যে, অমুকের মুড বা মন-মেজাজ কিছুদিন যাবৎ খুব খারাপ ছিল। মাঝে মাঝে অল্পতেই তার মেজাজ রুক্ষ হয়ে যেত, মাঝে মাঝে অবসন্ন থাকত এ আর এমন কি? আমাদেরও মাঝে মাঝে এমন হয়। কাজেই তাকে পৃথক করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল, এটিই ভয়াবহ নীরব ঘাতক বিষণíতা বা ডিপ্রেশনে রূপ নিল।

আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি অ্যালকোহল যাকে আমরা অনেকে মদ বলে জানি তা অনেক দেশেই সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আমাদের দেশে কাউকে আপনি দেখলেন যে মাঝে মাঝে অ্যালকোহল সেবন করে­কদাচিৎ অন্য কোনো ড্রাগস বা মাদক সেবন করে। আপনি কি জানেন যে পরবর্তীতে আপনার এ বন্ধুটিই মাদকাসক্ত হয়ে পড়তে পারে, যা হয়তো আগে চিন্তা করেননি।   চিন্তা করলেও হয়তো ওভাবে গুরুত্ব দেননি। কাজেই মানসিক অসুস্খতা হওয়ার আগেই বুঝতে চেষ্টা করুন, আপনি কোনো গুরুতর মানসিক ব্যাধিতে জড়িয়ে পড়ছেন কি না।
সতর্কতা উদ্রেককারী লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ
 ঘুমের সমস্যা, অনিদ্রা, ঘুম আসতে সমস্যা, ঘুম বারবার ভেঙে যাওয়া, রাত অনেক বাকি থাকতে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং আর ঘুমাতে না পারা। দিনে বা রাতে অনিয়মিত চক্রে ঘুমানো (যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে তাদের বেলায় এমনটি হতে পারে)
 সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া। নিজেকে পৃথক কিছু ভাবা বা বেশির ভাগ সময় একা একা কাটানো
 মানুষের সাথে সামাজিক আন্ত:সম্পর্কে ক্রমশ অবনতি ঘটা
 কখনো খুব বেশি কর্মতৎপরতা বা কখনো একেবারে কর্মহীন থাকা এবং এ দুটি ব্যাপার ঘুরেফিরে আসা
 চরম শত্রুতা, ভয়ভীতি অথবা সবকিছুতে সন্দেহপ্রবণতা
 কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা বা মনোনিবেশ করতে সমস্যা
 বন্ধুত্বে বা ভালোবাসায় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ান্বিত হওয়া বা পারিবারিক অসম্মতি
 নিজের ব্যক্তিগত যত্ন না নেয়া বা নিজের প্রতি খেয়াল না রাখা
 সব সময়ই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা
 কোনো কারণ ব্যতিরেকে পরিবারে অনেক বিষয় লুকানো বা প্রকাশ না করা
 অপ্রকৃতিস্খ আবেগজনিত প্রতিক্রিয়া
 বিমূর্ত কোনো কিছু বারবার লেখা ও শিশুর মতো অস্পষ্ট আঁকিবুঁকি করা
 আবেগহীন মুখাবয়ব বা চোখে-মুখে আবেগের প্রকাশ না থাকা

 এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, চোখের পাতা না ফেলা বা অহেতুক বারবার চোখের পাতা ফেলা

 শব্দ বা আলোকের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা স্পর্শকাতরতা

 অদ্ভুত শব্দ বা ভাষায় কথা বলা

 অপ্রকৃতিস্খ আচরণ যেমন পরিচিত কাউকে গায়ে স্পর্শ করতে না দেয়া, বারবার মোজা পরা ও খোলা, বারবার শেভ করা, নিজেকে নিজে কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করে কষ্ট দেয়া। ওপরে আমরা মানসিক রোগের কতক উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ করলাম তার মানে কিন্তু এই নয় যে, এর দু-একটা উপসর্গ কারো থাকলে সে বুঝি মানসিক রোগী। তবে কারো যদি একগুচ্ছ উপসর্গ থাকে, তবে বুঝতে হবে তিনি মানসিক অসুস্খতার ঝুঁকির সম্মুখীন অর্থাৎ তিনি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্খান করছেন।

এবার আচরণের পালা। মন-মানস নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমরা চোখে দেখতে পাই যা তা হলো ব্যক্তির বিহেভিয়ার বা আচরণ। তাই মনের মতো বিমূর্ত বিষয়ে ইতি টেনে বিজ্ঞানীরা ঝুঁকে পড়েছেন আচরণ নিয়ে গবেষণায়। দেখুন তো আপনার আগের আচরণগত ও বর্তমান আচরণ জগতের মাঝে অনেক বেশি পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে কি না? একটু ভাবুন তো যদি বুঝতে পারেন যে বর্তমান ও অতীত আচরণে বিশাল ফারাক, তবে বিলম্ব না করে মনোচিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিন।
কীভাবে ও কোথায় সিজোফেন্সনিকরা চিকিৎসা সেবা পাবেন
সিজোফেন্সনিকরা বুঝতে পারেন না যে, তারা মানসিকভাবে অসুস্খ। ফলে তারা আদৌ চিকিৎসার প্রয়োজনবোধ করেন না। কাজেই তাদের চিকিৎসা করানোর ব্যাপারটি গিয়ে বর্তায় পরিবারের অন্য সদস্য বা নিকটাত্মীয়ের ওপর। অতএব ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে কিছু ব্যাপারে আগেই ভেবে নিন যেগুলো রোগীকে ডাক্তার দেখানোর পরিবেশকে সহজ করে তুলবে। প্রথমত আপনি একটু সচেতনভাবে খেয়াল করে দেখুন যে, আপনার আত্মীয় রোগীটি চিকিৎসকের কাছে যেতে চাচ্ছে না, রোগী বা রোগিণী বুঝতেই পারছে না যে, সে কোনো ধরনের মানসিক অস্বাভাবিকতা বা মনোগত ভারসাম্যহীনতায় আক্রান্ত। তাই সিজোফেন্সনিকরা এ সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ থাকেন। যেহেতু সিজোফেন্সনিকদের অন্তর্দৃষ্টির সম্পূর্ণ অনুপস্খিতি থাকে অর্থাৎ তারা যে মানসিকভাবে অসুস্খ তা তারা বুঝতে পারেন না তাই তারা মনে করেন তাদের মাঝে মনোগত কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কদাচিৎ তারা তাদের মানসিক সমস্যা সম্পর্কে একটু ধারণা লাভ করে থাকেন, ফলে তারা তাদের সমস্যাটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে মাসের পর মাস শঙ্কা বা দ্বিধায় কাটিয়ে দেন। অনেক সময় দেখা যায় যে, সিজোফেন্সনিয়ার রোগী তাদের সর্বোচ্চ মানসিক শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও ট্যালেন্ট দিয়ে প্রমাণ  করতে চান যে, তাদের মাঝে মানসিক কোনো সমস্যা নেই, বরং তারা সম্পূর্ণভাবে সুস্খ। কাজেই আপনি যখন রোগীকে ডাক্তারের সাথে দেখা করার কথা বলবেন তখন তিনি মোটেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। তাই রোগীর আত্মীয়রা রোগীকে যখন বোঝাবেন তখন কিছু কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। রোগীকে কখনোই বলা যাবে না যে, তাকে জাদুটোনা করা হয়েছে অথবা অতিপ্রাকৃতিক কোনো শক্তির প্রভাবে তার অবস্খা এ রকম হয়েছে। আবার ‘তুমি কেন এ রকম অদ্ভুত আচরণ করছ’­ এ ধরনের কথাও বলা অনুচিত। অনেকে আবার বলে বসেন যে, তুমি দিন দিন আরো বোকা ও অলস হয়ে যাচ্ছ, এতে করে আপনি সত্যিকার অর্থে রোগীকে আরো পিছিয়ে দিলেন। তার সাথে শত্রুতাপূর্ণ বা বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের পরিবর্তে সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলুন। অনেক পরিবারে দেখা যায় যে, পারিবারিক সদস্যরা গোলমিটিং বসিয়ে সিজোফেন্সনিকদের জীবন আচরণের সমালোচনা করেন এবং মানসিক ভারাক্রান্তের সামনেই বলে বসেন যে, আমরা তোমার অবাক করা আচরণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তুমি চাও বা না চাও, আমরা তোমাকে জোর করে হলেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। এতে করে সিজোফেন্সনিক রোগীর অবস্খা আরো খারাপ হয়ে সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এটি কোনোভাবেই রোগীকে স্বস্তি দেবে না। অনেকে আবার এমনটি বলে থাকে যে, তোমার আচরণ তোমার মাকে বিপর্যস্ত করে বা তোমার বাবা কিন্তু এহেন আচরণের জন্য তোমার প্রতি খেপে আছেন। সিজোফেন্সনিয়ার রোগীকে এভাবে বললে তার বর্তমান অবস্খার আরো অবনতি ঘটতে পারে।

এবার আসুন সিজোফেন্সনিয়ার রোগীকে ডাক্তার দেখানোর জন্য কীভাবে রাজি করাবেন। আপনি রোগটির নানা উপসর্গ যেমন রোগী ঘুমাতে পারে না, তার কোনো শক্তি বা মানসিক সাহস থাকে না, তার দু:খবোধ থাকতে পারে বা তিনি হাসির স্খলে কেঁদেও দিতে পারেন ইত্যাদির ওপর গুরুত্বারোপ করুন। আপনি বরং এভাবে বলতে পারেন যে, তোমার সম্ভবত রাতে ঠিকঠাকমতো ঘুম হচ্ছে না তাই তুমি সারা দিন ক্লান্ত ও অবসন্ন কাটাও। কাজেই চলো আমরা একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করি­ এভাবে বারবার নানাভাবে তাকে বোঝাতে হবে। তবে অবশ্যই রোগীকে উত্তেজিত না করে। তখন রোগী অবশ্যই মেনে নেবে যে, ডাক্তার আরো সহায়তা করতে পারবেন এবং ডাক্তার সম্ভবত জজ বা উকিলের মতো যুক্তিতর্কে তার সাথে অবতীর্ণ হবেন না। এরপর মানসিক রোগী যখন ডাক্তার দেখাতে সায় দেবেন তখন তাকে নিয়ে অভিজ্ঞ মনোচিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করুন। তিনি নি:সন্দেহে আপনার রোগীকে নানাভাবে চিকিৎসা সেবা দেবেন। এখন মানসিক রোগীকে যদি কোনোভাবেই রাজি করানো না যায় তবে আপনি নিজে একা মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিন; কীভাবে আপনার রোগীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে আনা যায় এ ব্যাপারে ডাক্তার আপনাকে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ জানেন যে, সিজোফেন্সনিয়ার রোগীদের সাথে কী রকম আচরণ করতে হয়। তবে আপনাকে বুঝতে হবে যে, রোগীকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল না­রোগীকে আরো অনেকবার মনোচিকিৎসকের কাছে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে। কেননা এ রোগটি সারতে সময় যেহেতু একটু বেশি লাগে তাই ওষুধের ডোজ বদলানোর জন্য ও রোগীর সার্বিক অবস্খা মূল্যায়নের জন্য বেশ কয়েকবার মনোচিকিৎসকের কাছে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে।
সিজোফেন্সনিয়া রোগীর যাবতীয় রেকর্ড সংরক্ষণ
সিজোফেন্সনিয়ার রোগীর যাবতীয় দৈনন্দিন আচরণ ও কার্যাবলি লিখে সংরক্ষণ করার প্রয়াস নিন। ইতিমধ্যে আপনারা জেনে গেছেন যে, এ মানসিক অসুখটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ এর চিকিৎসাও অনেক দিন চালিয়ে যেতে হবে। সিজোফেন্সনিক রোগীকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করানোর কোনো বিকল্প নেই। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের বা সাইকিয়াট্রিস্টের সমস্ত প্রেসক্রিপশন এবং ল্যাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কীয় অন্য কোনো কাগজপত্র থাকলে তাও এক সাথে সংরক্ষণ করুন।

সমস্ত রেকর্ড থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি দরকারি তথ্যগুলো আলাদা কাগজে স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তাকারে লিপিবদ্ধ করতে চেষ্টা করুন। অপরিচিত ও অসংলগ্ন শব্দ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন। যারা মানাচিকিৎসক তারা মূলত আচরণ লিপিবদ্ধ করার ওপর বেশি জোর দেন। মনে করুন প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে ডাক্তারের কাছে আনার পর ডায়াগনোসিস করা হলো যে রোগী সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত। এক্ষেত্রে ওষুধ ব্যতীত নানা আচরণ সম্পর্কীয় অস্বাভাবিকতা কেমন ছিল এবং ওষুধ সেবন করানোর পরে ধীরে ধীরে রোগীর আচার-আচরণ ও জীবন-যাপনে কতটুকু স্বাভাবিকতা ফিরে এলো তা মনোচিকিৎসক পরবর্তীতে রোগীর রেকর্ড দেখে সহজেই শনাক্ত করতে পারবেন। ফলে তিনি সহজেই বুঝতে পারবেন যে, ড্রাগ বা ওষুধ পাল্টানোর প্রয়োজন আছে কি না অথবা ওষুধের ডোজে কোনো পরিবর্তন আনতে হবে কি না। একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে আচরণগত ব্যাপারটি পরিষ্কার করছি। সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত রহিম মিয়া। রহিম মিয়া গোসল করতে চায়, খেতে চায় না এবং প্রতিদিন একই ময়লা কাপড়-চোপড় পরে ঘুরে বেড়ায়­এভাবে আপনি আচরণকে বর্ণনা করতে পারেন। পক্ষান্তরে কেউ লিখতে পারেন যে, রহিম মিয়ার অবস্খা শোচনীয় বা ভয়ঙ্কর­ এ ধরনের কথাবার্তার চেয়ে ওপরের মতো করে তার আচরণ স্পষ্টভাবে লিখুন।

সিজোফেন্সনিয়া অসুখটি যেহেতু দীর্ঘদিন থাকে তাই দেখা যায় যে, রোগীর আত্মীয়-স্বজনদেরও ডাক্তার বদলানো একটা বাতিক হয়ে দাঁড়ায়। তারা মনে করে অমুক ডাক্তারের ওষুধে ভালো কাজ হচ্ছে না, আরেকজন মনোচিকিৎসককে আবার রোগীকে দেখিয়ে তারা অন্য ব্যবস্খাগত অনুসারে রোগীকে ড্রাগস সেবন করায়। এতে করে আসলে মানসিক অসুখটি আরো জটিল রূপ ধারণ করে। তবে ডাক্তার বদলানোর ক্ষেত্রেও কিন্তু রোগীর আগের রেকর্ডপত্রগুলো অত্যন্ত কাজে লাগবে। তিনি আগের রেকর্ডগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে রোগীর অসুস্খতা সম্পর্কে পরিষ্কার একটি ধারণা খুব অল্প সময়ের মাঝে লাভ করতে পারবেন।

সিজোফেন্সনিয়ার রোগীরা অনেক সময় বেশি সন্দেহপ্রবণ থাকে। তাই আপনি যখন তার রেকর্ড রাখবেন তখন একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে ভুলবেন না। যদি কোনোভাবেই সিজোফেন্সনিক রোগী বুঝতে পারেন যে, আপনি তাকে না জানিয়ে তার যাবতীয় কাজের রেকর্ড রাখছেন, তাহলে হিতের চেয়ে অহিতের সম্ভাবনাই বেশি। তাই রোগীকে সব সময় আশ্বাস দিন, রোগীর বিরুদ্ধাচরণ করবেন না। যদি বুঝতে পারেন যে, রোগী আপনার সাথে সহযোগিতা করছে তবে আপনার জন্য এ কাজগুলো করা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
সিজোফেন্সনিয়া রোগ নির্ণয় (ডায়াগনোসিস)
সিজোফেন্সনিয়া রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো প্যাথলজিক্যাল ডায়াগনোসিস বা ল্যাবটেস্ট নেই। তাই অসুখটি ডায়াগনোসিস করা হয় রোগীর উপসর্গ ও লক্ষণ দেখে। রোগীর কথাবার্তা, চাল-চলন, হাব-ভাব, আচার-আচরণ ইত্যাদি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন অভিজ্ঞ মনোচিকিৎসক রোগীর সাথে কথাবার্তা বলে সহজেই রোগটিকে ডায়াগনোসিস করতে পারেন। সিজোফেন্সনিয়াকে ডায়াগনোসিস নিশ্চিত করতে হলে সাথে আরো কিছু মনোশারীরিক অসুখের কথা চলে আসে।
 রোগীর ড্রাগে আসক্তি আছে কি না? রোগী অ্যালকোহল, ফেনসিডিল, মারিজুয়ানা, হেরোইন, মরফিন বা অন্য কোনো মাদকে আসক্ত কি না?
 রোগীর এপিলেপসি বা মৃগীরোগ আছে কি না
 ব্রেন টিউমার বা মস্তিষ্কে টিউমার আছে কি না
 থাইরয়েড গ্রন্থির গণ্ডগোল বা অন্য কোনো বিপাকীয় সমস্যা আছে কি না (হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করার নিম্নমাত্রা)

মনোচিকিৎসক সবকিছু খতিয়ে দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নেবেন যে, রোগী সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত। রোগীর অন্য মানসিক সমস্যা যেমন­ ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিস বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার আছে কিনা তাও বিবেচনায় আনতে হবে। কতক রোগী রয়েছে যাদের সিজোফেন্সনিয়ার কিছু বৈশিষ্ট্য ও ম্যানিক ডিপ্রেসিভের কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। এ সমস্যাকে বলা হয় সিজোঅ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার। সিজোফেন্সনিয়ার রোগী তাদের ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনা, আচরণ ইত্যাদিকে নিজস্ব অনুভূতিতে যেভাবে প্রকাশ করেন তাকে সাবজেকটিভ ফিলিংস বলে। এটি হলো নিজের সম্পর্কে নিজের অনুভূতি বা ধারণা। মনোচিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্ট তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে যা বোঝেন তা হলো অবজেকটিভ বা উদ্দেশ্যমূলক অনুভূতি। অর্থাৎ রোগীর আচরণই মানসিক সমস্যা নির্ণয়ের প্রধান সোপান।

মনোচিকিৎসকের সাথে প্রথম সাক্ষাৎকারেই ডাক্তার সাহেব রোগীর সিজোফেন্সনিয়া হয়েছে বলে ডায়াগনোসিস করেন না। তিনি একটু সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে তবেই সিজোফেন্সনিয়া ডায়াগনোসিস করে থাকেন। অনেক রোগী সিজোফেন্সনিয়াকে সুপ্ত অবস্খায় মনে করে নেয়। ফলে তার আচরণগত অসামঞ্জস্যতা তখনো পুরোপুরি সিজোফেন্সনিকদের মতো প্রকাশিত হয় না। রোগটি যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখনই নানা উপসর্গ ও লক্ষণ পরিষ্কার বোঝা যায়। তাই একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে হয়তো রোগ নির্ণয় সঠিক নাও হতে পারে। সব সিজোফেন্সনিক রোগীর একই রকম উপসর্গ ও লক্ষণ থাকে না। এগুলোও রোগীভেদে পরিবর্তনশীল। যেহেতু এ মানসিক অসুখটি নিয়ে অনেক সামাজিক অপবাদ প্রচলিত হয়েছে, তাই মনোচিকিৎসকরা একেবারেই নি:সন্দেহ হয়ে তবেই বলেন যে, রোগীটি সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত।

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। ধরুন কারো সিজোফেন্সনিয়া অসুখটি ডায়াগনোসিস করা হলো। তাই বলে এটি কিন্তু একেবারে নি:সন্দেহে বলা যাবে না যে, তার অন্য কোনো মনোদৈহিক অসুখ নেই। তাই অন্যান্য সব সমস্যার কথাও ডাক্তারকে খোলাখুলিভাবে বলুন এবং তিনি কিসের ভিত্তিতে সিজোফেন্সনিয়া রোগ ডায়াগনোসিস করলেন তাও তার নিকট থেকে জেনে নিতে পারেন।
রোগীর গোপনীয়তা সংরক্ষণ
যে পরিবারে সিজোফেন্সনিয়ার রোগী রয়েছে সে পরিবারের সদস্যরা দুই দিন আগে বা পরে রোগটির গোপনীয়তার আইনগত ও নীতিগত ব্যাপারগুলোর সাথে অপ্রত্যাশিতভাবেই মুখোমুখি হয়ে থাকে। মেডিসিন বিষয়টিতেও রোগীর গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত মৌলিক। গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলও বটে। মেডিকেল নীতিশাস্ত্রে রয়েছে, রোগীর ব্যক্তিগত নানা সমস্যা অবধারিতভাবে গোপন রাখতে হবে এমনকি রোগীর মৃত্যুর পরেও। রোগী যদি নিজে সম্মতি প্রদান করে তবে গোপনীয়তা প্রকাশ করা আইন বা নীতির পরিপন্থী নয়। তবে একটি মেডিকেল দল বা টিমে যারা থাকবে তারা রোগীর রোগ সম্পর্কে জানতে পারে, কেননা তারা রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা করে থাাকেন। রোগীর সাথে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সদস্যকে রোগীর সম্মতিক্রমে তার সমস্যা ও সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে।

সিজোফেন্সনিয়া অসুখটি যেহেতু অনেক রকম সামাজিক অপরাধের সাথে জড়িত তাই এক্ষেত্রে মনোচিকিৎসকের উচিত আরো গোপনীয়তা সংরক্ষণ করা। উল্লেখ্য যে, কানাডাতে এসব গোপনীয়তা সংরক্ষণ ঠিকমতো না করলে ডাক্তারকে পর্যন্ত আইনি সমস্যায় পড়তে হয়। তবে রোগী যদি খুব অল্প বয়সের হয় বা মানসিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত থাকে তবে অবশ্যই রোগীর ভালো হবে বিবেচনা করে তার আত্মীয়-স্বজনের নিকট সব খুলে বলা যায়। যেমন­ স্বামী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে স্ত্রীকে অবশ্যই পুরো রোগটি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করতে হবে। সিজোফেন্সনিয়ার রোগীকে দেখাশোনা বা যত্ন নেয়ার জন্য বাইরের কাউকে নিয়োগ করলে রোগীর সেবাজনিত কারণে তাকে রোগী সম্পর্কে অবহিত করা পরিবারের সদস্যদের কর্তব্য। এতে করে নিযুক্ত ব্যক্তি রোগীর সেবা আরো নিবিড়ভাবে করবেন।
রোগী আক্রমণপ্রবণ হয়ে উঠলে বা সংকটকালীন অবস্খায় কী করবেন?
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, সিজোফেন্সনিয়া একটি বড় মাত্রার মানসিক রোগ। এ অসুখটিকে ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে তাতে বাস্তবতার সাথে রোগীর তেমন কোনো সম্পর্ক থাকে না। এটিকে সাইকোটিক এপিসোড বা ক্রাইসিস বলা হয়ে থাকে। সাধারণত রোগের লক্ষণ প্রকাশের ১ বছরের মধ্যে চিকিৎসা না করালে রোগী এ দশায় আক্রান্ত হতে পারে।

মানসিক সংকটকালীন বা সাইকোটিক দশায় মানসিক ভারাক্রান্ত রোগী যে উপসর্গ বা আচরণ করে তা হলো­ হ্যালুসিনেশন (অলীক প্রত্যক্ষণ, গায়েবি আওয়াজ ইত্যাদি)
 ডিলিউশন (ভ্রান্ত বিশ্বাস)
 চিন্তাধারার পরিবর্তন বা বিকৃত চিন্তাধারা
 আচরণ ও আবেগজনিত প্রকাশে অসামঞ্জস্যতা

সিজোফেন্সনিয়ার রোগী যখন এই সংকটকাল অতিক্রম করে তখন পরিবারের সদস্যরা প্রায়শ ঘাবড়ে যান বা তারা বুঝতে পারেন না ঠিক কী করা উচিত। তবে একটি ব্যাপারে আপনাকে বুঝতে হবে, রোগী এ সময়ে যে হ্যালুসিনেশন বা গায়েবি আওয়াজ শোনে তা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সিজোফেন্সনিকরা সাধারণত যে গায়েবি আওয়াজ শোনে বা অলীক প্রত্যক্ষণ করে তা মানে ও বিশ্বাস করে­এখানেই যত বিপত্তি। হয়তো সিজোফেন্সনিক কানে শুনতে পেল যে, পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়­ আপনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোগী পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়তে পারে। রোগী হয়তো চোখের সামনে জানালায় অনেক সাপ দেখে খুব ভয় পেয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুততার সাথে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে অর্থাৎ রোগীকে হাসপাতালে স্খানান্তর করতে হবে। নিচের নিয়মগুলো আপনাকে সংকট উত্তরণে সহায়তা করবে।
যা যা করা উচিত
যতটুকু সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। বিরক্তির উদ্রেক করে এমন ব্যাপারগুলোকে কমিয়ে আনুন। টেলিভিশন, রেডিও খোলা থাকলে বন্ধ করে দিন। ঘরে অন্য অনেক লোক থাকলে তাদের রোগীর রুম থেকে চলে যেতে বলুন। পরিস্খিতি মোকাবিলায় পারঙ্গম এমন লোক রোগীর সাথে কথা বলতে চেষ্টা করুন। রোগীকে খুব হৃদ্যতার সাথে বসতে বলুন ও শান্ত হতে বলুন। স্পষ্টভাবে ও নরম গলায় রোগীর সাথে কথা বলুন। রোগীকে টেকনিক্যাল বা কৌশলগতভাবে বোঝান যে, সে কোনো কারণে ভীত বা রাগান্বিত বা দ্বিধান্বিত। দয়া করে আমাকে বলুন কিসে আপনি ভয় পাচ্ছেন বা কী আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে বা পীড়া দিচ্ছে। কখনোই রোগীকে বলবেন না যে, তুমি শিশুর মতো আচরণ করছ বা আমি যা বলব তুমি তাই করবে। রোগী যদি আপনার কথা বুঝতে না পারে তবে প্রয়োজনবোধে তাকে আরেকবার শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন। রোগীর গা ঘেঁষে বা খুব কাছাকাছি থেকে কথা বলবেন না বরং একটু দূরত্ব বজায় রাখবেন। রোগীর সামনে খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করবেন না, এতেও অহিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যা যা করা উচিত নয়
রোগীর রুমে ঢুকে চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না। এমনও হতে পারে আপনার রোগী কানে যেসব গায়েবি আওয়াজ শুনছে সেগুলোর তীব্রতা আপনার চিৎকারের চেয়ে বেশি। রোগীর সমালোচনা করবেন না। রোগীর চোখের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকবেন না, ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করবেন না। রোগীর সাথে কোনো বিষয়ে কুতর্কে জড়াবেন না।

রোগীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করুন। রোগী ইচ্ছাকৃতভাবে হাসপাতালে যেতে চাইলে সবচেয়ে ভালো। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রোগী হয়তো আপনার সাথে হাসপাতালে যেতে রাজি নয় কিন্তু তার প্রিয় কেউ বললে সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়। তাই রোগীর কোনো প্রিয় বন্ধু থাকলে তাকে খুঁজে বের করে তাকে দিয়ে চেষ্টা করুন। প্রিয় বন্ধুর উপস্খিতিতে অনেক সময় রোগীর আশাহত ভাব অনেকটা কমে যেতে পারে।

পরিবারের অনেক সদস্য আবার এ ভয়ে ভীত থাকে, কখন যেন সিজোফেন্সনিক রোগী আক্রমণাত্মক হয়ে যাবে। তাকে মারধর শুরু করে। এক্ষেত্রে রোগী ঘরের জিনিসপত্র, জানালা ইত্যাদি ভাঙচুর শুরু করতে পারে। এগুলো মূলত বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীনতার জন্য করে থাকে। রোগী অনেক সময় নিজের ক্ষতি নিজে করে বসে। সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত কোনো এক    সন্তানের মায়ের কথা শুনুন। তার সন্তান নাকি তীক্ষîস্বরে চেঁচেয়ে বলছিল­ আল্লাহ তাকে বলছে মাকে মেরে ফেলার কথা। এসব ক্ষেত্রে আপনি যেভাবেই হোক নিজেকে যে কোনো ধরনের শারীরিক আঘাত থেকে রক্ষা করুন। বিপজ্জনক সময়ে সাময়িকভাবে কোনো রুমে আটকে রাখতে পারেন। তবে তা অবশ্যই সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে। এ ধরনের অমানসিক ও অমানবিক ব্যবস্খা কেবল জরুরি অবস্খাতেই করা উচিত।
পুলিশের সহায়তা নেবেন কি না :
সিজোফেন্সনিক যখন আক্রমণাত্মক বা ধ্বংসাত্মক
যেসব পরিবারের সিজোফেন্সনিক রয়েছে তারা সাধারণত পুলিশ ডাকতে ইতস্তত বা দ্বিধায় ভোগেন। তাদের মনে এ ধারণা বিরাজ করে যে, পুলিশ কেবল ক্রিমিনাল বা অপরাধীদের সাজা দেয়ার জন্য নিয়োগ করা যায়। যেহেতু সিজোফেন্সনিয়ার রোগীকে তারা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে মনে করেন, তাই তারা মূলত পুলিশ ডাকতে চান না এবং তাদের মনে এ ধারণাও বিরাজ করে যে, তারা হয়তো পরিবারের যে সদস্যটি সিজোফেন্সনিক তাকে পরিত্যাগ করছে এবং তার ওপর অন্যায় আচরণ করছে পুলিশ ডেকে। তথাপি অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ ডাকার কোনো বিকল্প থাকে না। কোনো কোনো পরিবারের সদস্যরা বলেন যে, তারা রোগীকে হয়তো বলল যে, আমরা পুলিশ ডাকছি­ অনেক রোগী আত্মীয়-স্বজনের এ রকম আচরণে অনেকটা শান্ত হয়ে পড়ে। রোগী অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারে যে, তার অস্বাভাবিক আচরণ সবার সহ্যসীমার বাইরে ছিল।

সিজোফেন্সনিক রোগীর এক বাবা এসে বলেছিলেন যে, তার ছেলে পুলিশের পোশাক পরা কাউকে দেখলেই বিশেষ পরিস্খিতিতে শান্ত হয়ে যেত। অনেক পরিবার আবার এসব ছলচাতুরী বা কৌশলের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং তারা বলেছে যে এটি নৈতিকতাবিবর্জিত। এবার প্যারানয়েড সিজোফেন্সনিয়ায় ভুগছে এমন একটি পরিবারের এক মেয়ে সদস্যের কথা বলছি। আপনারা হয়তো জানেন যে, যারা প্যারানোয়াতে আক্রান্ত তারা খুব বেশি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত থাকে। এ রকম একজন সিজোফেন্সনিয়ার রোগী তার সামনে পুলিশের পোশাক পরা কাউকে দেখলে (বিশেষত সে যদি তার পরিবারের সদস্য হয়) তার সন্দেহপ্রবণতা আরো বেড়ে যায় এবং সে মনে করে যে, তাকে মেরে ফেলার বা তার কোনো ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র তার পরিবারের সদস্যরা করছে। এতে তার সার্বিক অবস্খার আরো অবনতি ঘটে থাকে। সবকিছুর পরে মূল কথা হলো যে, আপনি আপনার পরিবারের সদস্যকে সবচেয়ে ভালো করে চেনেন ও জানেন, তাই কোন কৌশল তার বেলাতে উপযোগী হবে তা সবচেয়ে ভালো আপনিই বুঝবেন। অতএব পরিস্খিতি মোকাবিলায় সেভাবেই এগোতে চেষ্টা করুন।

সিজোফেন্সনিয়াতে ভুগছে এমন রোগীরা যখন পরিবারে বা রুমে যখন কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয় তখন আপনি পুলিশের সাহায্য নিতে পারেন। তবে সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক জরুরি ভিত্তিতে নেয়া উচিত। এরা অনেক সময় মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর, জানালা ভাঙচুর অথবা কাউকে শারীরিকভাবে জখম করতে পারে। কাজেই আপনি পুলিশের সহায়তায় তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে স্খানান্তর করুন। তবে পুলিশকে আপনি আগেভাগেই অবহিত করবেন যে, সিজোফেন্সনিয়ার রোগীর সাথে কোনো অস্ত্র আছে কি না।
সংকটকালীন অবস্খা : জরুরি পরিকল্পনা
পরিবারের কোনো সদস্য সিজোফেন্সনিক থাকলে আপনাকে আগেভাগেই জরুরি অবস্খায় কী করতে হবে তা জেনে নিন­

১.সিজোফেন্সনিয়া রোগীর চিকিৎসা
সিজোফেন্সনিয়ার চিকিৎসা একটু দীর্ঘমেয়াদি। রোগীকে মেডিকেশন বা ওষুধ নিয়মিত সেবন করাতে হয়। অনেকের বেলায় সহায়তাকারী বা সমর্থনমূলক কাউন্সিলিং করা হয়। অবশ্য অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পুনর্বাসন চিকিৎসার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীকে বাসায় রেখে বা হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাবেন কি না তা মূলত রোগটির তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। তাই সিজোফেন্সনিয়া রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্খাপনা রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে বা পরিবারের সদস্যকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।
মেডিকেশন বা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা
যেসব সিজোফেন্সনিয়ার রোগী অসুখটির সুনির্দিষ্ট উপসর্গে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে নিউরোলেপটিক বা অ্যান্টিসাইকোটিক (মনোবিকারবিরোধী) ওষুধ খুবই কার্যকরী। এগুলো সেবনের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের ভেতর রোগীর সুনির্দিষ্ট উপসর্গ যেমন গায়েবি আওয়াজ, অলীক প্রত্যক্ষণ, ভ্রান্ত বিশ্বাস ইত্যাদি কমতে শুরু করে। কতক রোগীর বেলায় এগুলো কমতে মাসাধিককাল লাগতে পারে। যাদের সিজোফেন্সনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বারবার থাকে তাদের ক্ষেত্রে তীব্র উপসর্গগুলো দূরীকরণে নিউরোলেপটিকস ব্যবহার করা হয়। তবে ক্রনিক অবস্খা বা আবেগহীনতা ইত্যাদি উপসর্গগুলো সারাতে সময় একটু বেশি লাগে।

সিজোফেন্সনিয়ার ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। এটি স্নায়ুতন্ত্রে বিভিন্ন কোষের মাঝে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাসায়নিক দূত হিসেবে কাজ করে। তাই দেখা যায় যে, সিজোফেন্সনিকদের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিসেপ্টরের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে এবং এদের মস্তিষ্কে সাধারণের তুলনায় অসংলগ্ন বা অসামঞ্জস্য সংকেত বহন করে থাকে। এগুলো পরবর্তীতে রোগীর আচরণে পরিষ্কার রূপ নেয় এবং বিভিন্ন ধরনের সাইকোটিক উপসর্গ দেখা দেয়।

সিজোফেন্সনিয়ার চিকিৎসায় যেমন নিউরোলেপটিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলো ডোপামিনের লেভেলকে কমাতে সাহায্য করে। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কী ধরনের মনোবিকারবিরোধী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে তা অনেক সময় ট্রায়াল দিয়ে ঠিক করে নিতে হয়। কতক ড্রাগের প্রতি রোগীদের আবার অধিক সংবেদনশীলতা রয়েছে।

ওষুধ দিয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমে অল্পমাত্রার ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। কয়েক দিন পর রোগী ভালো অনুভব করতে শুরু করলে ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রোগীকে সেবন করাতে হবে। ওষুধ সেবনের পরিমাণ কমবে কি বাড়বে তা অবশ্যই অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো মেনে চলতে হবে।

নিউরোলেপটিক ওষুধগুলো ট্যাবলেট বা তরলাকারে পাওয়া যায়। অথবা ইনজেকশনের মাধ্যমেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। বেশির ভাগ রোগীকে মুখে সেবনযোগ্য ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। তবে রোগীর তীব্র উপসর্গ থাকলে ইনজেকশন ব্যবহার করলে তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যায়। মনোবিকারবিরোধী ওষুধগুলোর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে রোগী কয়েকদিন ওষুধ খেয়ে হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। এক্ষেত্রে জানা উচিত যে, প্রাথমিক পর্যায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো যতটুকু না তীব্র হয় কিছুদিন সেবন করে গেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো শরীরের সাথে সয়ে যায়। সবচেয়ে কমন বা প্রচলিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হলো­

তীব্র ডিসটনিয়া : ঘাড় এবং চোয়ালের মাংসপেশিগুলো টানটান বা একটু শক্ত হয়ে যাওয়া ঘুম ঘুব ভাব বা নিদ্রালুতা
 হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
 শারীরিক শক্তি কমে যাওয়া বা অলসতা ভাব
 য়ে যাওয়া
 অস্পষ্ট দৃষ্টি বা ঝাপসা দৃষ্টি
 সূর্যালোকের প্রতি সংবেদনশীলতা
 ওজন বেড়ে যাওয়া
 কোষ্ঠকাঠিন্য

আবার কয়েকটি ওষুধ সেবন করার পর আরেকটি উপসর্গ দেখা দেয় যাকে আমরা টারটিভ ডিসকাইনেসিয়া বলি। এতে রোগীর মুখমণ্ডলের মাংসপেশির অনিচ্ছাকৃত সংকোচন হতে পারে। হাত-পায়ের মাংসপেশিগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ও অনিচ্ছাকৃত কম্পন বা পেশি সংকোচন হতে পারে। এই অবস্খায় ওষুধের ডোজ হঠাৎ করে কমালে উপসর্গগুলো আরো বেড়ে যেতে পারে। তবে সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত পরিবার অনেক সময় অন্যান্য উপসর্গ যেমন­ শরীরের কোনো অংশের অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া ও দৈহিক শক্তির নি:শেষিত হওয়ার কথা বলে। তারা হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করে দিতে পারে। তাই ওষুধ বন্ধ করার পূর্বে বা ডোজ কমানোর পূর্বে অবশ্যই মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সমর্থনমূলক থেরাপি
এটি মূলত এক ধরনের সাইকোথেরাপি। এতে বিভিন্নভাবে কথার সাহায্যে রোগীকে অসুখটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বোঝানো হয়ে থাকে। এর একটি মূল অংশ রোগীকে কেন্দ্র করে। রোগী তার মানসিক সমস্যাগুলো বা দ্বন্দ্বগুলো ডাক্তারকে খুলে বলেন। মনোচিকিৎসক এ সময়ে মূলত রোগীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন কীভাবে তিনি ভালো থাকতে পারেন। রোগী যাতে তার সামাজিক জীবনে চলমান থাকতে পারে এবং পরিবার ও সমাজে সুন্দর আন্ত:সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারে সেগুলো নিয়ে ডাক্তার রোগীকে বিভিন্নভাবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝান।

কতক রোগীর বেলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ব্যবস্খা নিয়ে কাউন্সিলিং বা আলোচনা করা হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে রোগীর যাতে ঝগড়া না হয় সে বিষয়েও ডাক্তার রোগীকে বোঝান। সম্প্রতি আরেকটি সাইকোথেরাপি আবিষ্কৃত হয়েছে, একে বলা হয় অন্তর্দৃষ্টিমূলক সাইকোথেরাপি। সিজোফেন্সনিয়া একটি তীব্র ও জটিল মানসিক ব্যাধি। এ অসুখটিতে বেশির ভাগ রোগী তারা যে অসুস্খ সেটাই বুঝতে পারে না। অর্থাৎ তাদের অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। এই বিশেষ সাইকোথেরাপিতে রোগীকে রোগীর নিজস্ব জগৎ থেকে বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেখানে কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে হয় তা শেখানো হয়।

সমর্থনমূলক থেরাপিতে মূলত চিকিৎসা ব্যবস্খাপনা, সামাজিকীকরণ, অর্থনৈতিক ব্যাপার চালনা এবং রোগীকে পুনর্বাসন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
অন্যান্য চিকিৎসা
 ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইসিটি)­এটিতে মূলত রোগীকে অ্যানেসথেসিয়ার মাধ্যমে অজ্ঞান করে মাথায় কতগুলো ইলেক্ট্রোড স্খাপন করে উচ্চমাত্রার ভোল্টেজ দিয়ে রোগীকে শক দেয়া হয়। এই সময় রোগীর মুখের মাংসপেশিতে খিঁচুনি হয়ে থাকে। সিজোফেন্সনিয়ার কতক রোগী এই থেরাপিতে বেশ উপকৃত হয়ে থাকে। ইসিটি মূলত প্রয়োগ করা হয় তীব্র বিষণíতার রোগীদের ক্ষেত্রে। অবশ্য ম্যানিক ডিপ্রেসভ সাইকোসিস বা যাদের মন-মেজাজের খুব বেশি পরিবর্তন হয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রেও এটি নির্দেশিত।
 পুষ্টি দিয়ে চিকিৎসা : অনেক সময় সিজোফেন্সনিয়া রোগীর ভিটামিন ‘বি’-এর অভাব থাকে। ডা. এইচ অসমন এই সম্পর্কে একটি থিওরি দিয়েছিলেন যাকে মেগাভিটামিন থিওরি বলে। এতে মূলত নিয়াসিন বা ভিটামিন বি৩ রোগীকে প্রচুর পরিমাণে সেবন করানো হয়। বর্তমানে এটি তেমন প্রয়োগ করা হয় না।
আমার কী করা উচিত
যাদের পরিবারে সিজোফেন্সনিক রয়েছে তাদের অনেকে বলেছেন, হাসপাতাল থেকে ফেরার পর রোগীর মূল সমস্যাগুলো অনেকখানি কমে গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যরা ভেবে নিয়েছিল যে, রোগী সম্পূর্ণরূপে সেরে উঠেছে। তারা বিশ্বাস করেছিল যে, উপযুক্ত থেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করলে রোগী হয়তোবা তাড়াতাড়ি পুরো সেরে ওঠে। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পরও পরিবারের সদস্যরা সিজোফেন্সনিকদের নিয়ে অন্য নতুন সমস্যায় পড়েন।
ওষুধ সেবনে রোগীর অনিচ্ছা
বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রোগীরা ঠিকমতো ওষুধ সেবন করতে চায় না বা পরিবারের কোনো সদস্য তাকে ওষুধ সেবন করাতে চাইলে বাধা প্রদান করে। মূলত এর জন্য নিচের ৫টি কারণ দায়ী।
 হয়তো আপনার রোগীর অন্তর্দৃষ্টির অনুপস্খিতি রয়েছে। তার ধারণা, সে সম্পূর্ণরূপে সুস্খ। অতএব ওষুধ  সেবনের কোনো প্রয়োজন নেই।
 যেসব সিজোফেন্সনিকরা প্যারানোয়া বা সন্দেহবাতিকগ্রস্ত থাকে তারা ওষুধ সেবন করাতে চাইলে মনে করে বসতে পারে তাকে ওষুধে বিষ মিশিয়ে খাওয়াচ্ছে, সে ক্ষেত্রে সে ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করবে।
 যেহেতু সিজোফেন্সনিয়ার চিকিৎসায় যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয় যেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে সেগুলোর জন্য রোগী ওষুধ সেবন করা থেকে বিরত থাকতে পারে।
 সিজোফেন্সনিয়ার চিকিৎসায় বেশ কয়েকটি ওষুধ প্রতিদিন সেবন করতে হয়। এক্ষেত্রে রোগী যেহেতু একটু দ্বিধাগ্রস্ত থাকে তাই কোনো ডোজ বাদ পড়তে পারে এবং ওষুধ সেবনে অনীহা আসতে পারে।
 পরিবারের অন্য কোনো সদস্য রোগী সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে এই ভেবে ওষুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিতে পারে। তাদের মতে আর ওষুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই, যা সম্পূর্ণ অমূলক।
সিজোফেন্সনিয়ার তীব্র উপসর্গগুলো পুনরায় শুরু হওয়া
অনেক সিজোফেন্সনিয়ার রোগীদের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদিভাবে বিরাজ করতে পারে। তাই অসুখটির নানা উপসর্গ ঘুরেফিরে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আসতে পারে। কীভাবে বুঝবেন আপনার আত্মীয় সিজোফেন্সনিয়ায় আবার আক্রান্ত হচ্ছেন­
 ঘুমের সমস্যা বা সারারাত অঘুমে থাকা
 সমাজ থেকে আবার নিজেকে গুটিয়ে নেয়া
 ব্যক্তিগত স্বাস্খ্য সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়া
 চিন্তার পদ্ধতিতে গণ্ডগোল
 কথা প্রকাশে অসামঞ্জস্যতা
 অলীক প্রত্যক্ষণ
 গায়েবি আওয়াজ শোনা

আপনার রোগীর মাঝে যদি এ ধরনের আচরণজনিত অসামঞ্জস্যতা লক্ষ করেন তবে দেরি না করে তাড়াতাড়ি মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কী কী কারণে সিজোফেন্সনিয়ার উপসর্গগুলো পুনরায় প্রকাশ পেতে পারে
সিজোফেন্সনিয়া পুনরায় হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে বা স্পষ্ট কোনো কারণ নাও থাকতে পারে। যে যে কারণে উপসর্গগুলো পুনরায় প্রকাশ পেতে পারে সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো­
 ওষুধ সময়মতো নিয়মানুসারে সেবন না করা
 ওষুধ সেবন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া
 পারিবারিক বা সামাজিক সমর্থন না পাওয়া
 সাম্প্রতিককালে প্রিয়জনকে হারানো বা চাকরি হারানো বা নতুন স্খানে থাকা ইত্যাদি
 রোগীর ওপর মনোসামাজিক চাপ বা স্ট্রেস বেড়ে যাওয়া
 অ্যালকোহল, মারিজুয়ানা, গাঁজা ইত্যাদিতে আসক্তি
সিজোফেন্সনিক রোগীর আচরণ ও পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া
সিজোফেন্সনিয়া রোগটির যেহেতু আচরণজনিত নানা অসংলগ্নতা থাকে তাই পরিবারের সদস্যদের নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ মোকাবিলা করতে হয়। এক্ষেত্রে দুটি জিনিস স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা উচিত। রোগী যে আচরণ করে তার ঠিক কোন সীমা পর্যন্ত আপনি তা সহ্য করবেন এবং আচরণের অসংলগ্নতা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়ান্বিত হবেন। আচরণের ব্যাপারে পরিবারের সদস্যরা যে অস্বস্তিতে পড়েন তা বিভিন্ন উপায়ে কমানো যেতে পারে। যেহেতু আপনার রোগীকে আপনি সবচেয়ে ভালো জানেন তাই আপনি সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন কোন কৌশল অবলম্বনে রোগীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবেন। এটি আসলে ততটা কঠিন নয়। একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটি পরিষ্কার করছি। সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত একটি মেয়ের মা তার সাথে কী রকম আচরণ করবেন তা নিয়ে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি আসলে তার মেয়ের আবেগ বা অনুভূতিতে কোনো রকম আঘাত দিতে চাচ্ছিলেন না। তাই অধিকাংশ সময় মেয়েটি যখন অসংলগ্ন আচরণ করত তখন মা নীরব থাকতেন। অর্থাৎ মোটেও প্রতিক্রিয়ান্বিত হতেন না। আসলে তিনি বুঝতেই পারতেন না সে রকম পরিস্খিতিতে ঠিক কী রকম আচরণ করা উচিত ছিল। পরে দেখা গেল মেয়েটির ছোট ভাই দক্ষতার সাথে অসংলগ্ন আচরণের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। তার ভাই যখন টেলিফোনে অন্য কারো সাথে আলাপ করত তখন বোনটি তার পাশে এসে দাঁড়াত। সে মুহূর্তে ভাইটি কথা বলার সময় বেশ অস্বস্তি অবস্খায় পড়ত। একদিন সে তার বোনকে নরম গলায় বুঝিয়ে বলল, ‘আমি যখন কারো সাথে আলাপ করি তখন একা থাকতেই বেশি পছন্দ করি’। লক্ষ করুন সে তার বোনকে সরাসরি চলে যেতে বলেনি বা ধমকের সুরে আচরণ করেনি। এতে করে মেয়েটির কোনো অনুভূতিতেও সে আঘাত দেয়নি। সিজোফেন্সনিকদের সাথে পরিবারের সদস্যদের আচরণ সে রকম হওয়া উচিত­
 রোগীকে কখনোই বলবেন না যে তার আচরণ অসংলগ্ন। এতে করে সে আরো খেপে যাবে
 রোগীর সাথে নরম স্বরে বুঝিয়ে অল্প কথা বলুন
 কোনো কথা না বুঝলে তা আবার বলুন
 রোগী কোনো কিছু করতে থাকলে তাকে আদেশের সুরে তা বন্ধ করতে বলবেন না, বরং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে অপ্রত্যক্ষভাবে তাকে তা করা থেকে বিরত রাখতে হবে
 রোগীর সাথে কখনো বাগবিতণ্ডায় জড়াবেন না
 রোগী যদি প্যারানোয়াতে ভোগে, তবে তার দিকে তাকিয়ে হাসবেন না বা এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকবেন না।
সিজোফেন্সনিয়া রোগীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া
সিজোফেন্সনিয়া রোগীদের হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সিজোফেন্সনিক পরিবারের সদস্যদের এই ঝামেলায় পড়তে হয়। সিজোফেন্সনিক রোগীর মনে অদ্ভুত চিন্তার উদয় হয়। তারা প্রায়শ মনে করে অন্য কোথাও চলে গেলে বুঝি তাদের কষ্ট কমবে। তবে চিন্তাগুলো তারা নিজেরা করে না বরং বাইরের কোনো শক্তি যেন তাদের মাথায় চিন্তাগুলো ঢুকিয়ে দেয়। এই সময় তারা গায়েবি আওয়াজ শুনতে পায়­ এ স্খান ত্যাগ কর, অমুক স্খানে চলে যাও। এরা সাধারণত গায়েবি আওয়াজে যা শুনতে পায় তা মানে এবং করেও বটে। এই সময়ে আপনি পেপারে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিতে পারেন। রেডিও, টিভিতে নিখোঁজ খবর চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে রোগী নিজে ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। নিখোঁজ ব্যক্তির খোঁজ নিতে আপনি যা করতে পারেন­
 সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত রোগী যদি প্রায়শ কোনো স্খানের কথা উল্লেখ করে যেখানে সে যেতে চায় প্রথমে সেখানে খোঁজ নিন। এতে আপনার সমস্যার সমাধান হতে পারে।
 সিজোফেন্সনিক রোগী যদি ভ্রমণ করতে চায় তবে কৌশলে সব সময় তাদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবেন যেমন­ আপনার রোগীর সাথে টাকা খুব কম পরিমাণে দেবেন এবং আপনার নিকট থেকে চেয়ে নিতে পারে তাই রোগীর কাছাকাছি অবস্খান করবেন।
 সিজোফেন্সনিয়ার রোগী হারিয়ে গেলে রোগীর কোন প্রিয় বন্ধু বা আত্মীয় তাকে বেশি পছন্দ করে তার বাসায় খোঁজ করুন।
সিজোফেন্সনিয়া ও আত্মহত্যার ঝুঁকি
নানা ধরনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সিজোফেন্সনিয়ার রোগী ও আত্মহত্যার মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ অসুখটির সাথে ডিপ্রেশন বা বিষণíতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, অলীক প্রত্যক্ষণ, গায়েবি আওয়াজ ইত্যাদি জড়িত থাকায় রোগী আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। এরা অনেকটা বাধ্য হয়েই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মনোবিজ্ঞানী টরি অবশ্য বলেছেন যে, সিজোফেন্সনিয়া রোগীদের শতকরা ১০ ভাগ কোনো না কোনো উপায়ে নিজেদের ক্ষতি করে থাকে। রোগীর আচরণ দেখে কীভাবে বুঝবেন সে আত্মহত্যা করতে পারে কি না।
 আপনার রোগী যদি ঘনঘন আত্মহত্যার কথা বলে
 রোগী যদি আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা বলে
 রোগীর যদি আত্মসম্মানবোধ না থাকে বা নিজের সম্পর্কে হীনম্মন্যতা থাকে
 ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যদি আশাহত অনুভূতি থাকে
 রোগী যদি গায়েবি আওয়াজ শুনতে পায় বা কোনো অলীক প্রত্যক্ষণ দেখতে পায় যা তাকে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে
সিজোফেন্সনিয়া রোগীর পরিবারের সদস্যদের
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে কতক সিজোফেন্সনিক রোগী শান্ত প্রকৃতির আবার কতক রোগী সময় সময় আক্রমণাত্মক বা হিংসাত্মক হয়ে পড়ে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এরা পরিবারের সদস্যদের জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সিজোফেন্সনিক রোগী সংকটকালীন অবস্খায় আত্মীয়-স্বজন বা আগন্তুককে মারধর করতে পারে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে পারে। সিজোফেন্সনিয়াকে একটি সামাজিক অপবাদ হিসেবে এখনো পর্যন্ত গণ্য করা হয়। তাই অনেক পরিবারই স্বীকার করতে চায় না তার পরিবারের কোনো সদস্য সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত। তারপরেও সব সিজোফেন্সনিক রোগীর পরিবারের জানা উচিত যে, বর্তমানে অসুখটির খুব ভালো চিকিৎসা আমাদের দেশে রয়েছে। রোগী যদি তার অবস্খাকে অস্বীকার করে, সামাজিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং লজ্জা ও অপরাধবোধে ভোগে, চিন্তা করতে সমস্যা হয়, মানুষের সাথে কথা বলতে না চায়, মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, অধিকাংশ সময় অবসন্ন হয়ে পড়ে, ঘুমের সমস্যায় ভোগে ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে তবে সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে রোগীকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের নিকট নিয়ে যান।
সিজোফেন্সনিয়া ও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়া
যারা দীর্ঘদিন যাবৎ সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত অথচ কোনো চিকিৎসা নেননি তারা দীর্ঘমেয়াদি নানা অসুবিধায় খুব কষ্ট অনুভব করে থাকেন। এদের দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তিবোধ থাকে, জীবন সম্পর্কে কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে না, নিজস্ব আত্মসম্মানবোধ একদম কমে যায় ও তারা আবেগ-অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এরা মাথাব্যথায় ভোগে, অনিদ্রায় ভোগে, ড্রাগ বা অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অন্যান্য নানারকম মনোশারীরিক চাপে ভোগে। এভাবে রোগী ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এই নিস্তেজ অবস্খা প্রতিরোধে যা করণীয়­ নিজের স্বাস্খ্যের প্রতি নজর দিন
 প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন
  প্রতিদিন সামান্য ব্যায়াম হলেও করুন
 পরিমিত ঘুমান
 নিয়মিত ডাক্তারকে দিয়ে চেকআপ করান, আপনার পরিবারের সিজোফেন্সনিক থাকলে তাকে জানান
 বিভিন্ন ধরনের রিলাক্সেশন পদ্ধতি বা শিথিলায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মনোচিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন
 প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করে নিজের ব্যক্তিগত শখে ব্যয় করুন
 নিজেকে অপরাধী বা দোষী ভাববেন না এবং যে সমালোচনা আপনার ক্ষতি করতে পারে নিজের সম্পর্কে সে রকম ধ্বংসাত্মক সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন।
 আপনার আত্মীয় রোগীটি যদি সিজোফেন্সনিয়ায় আক্রান্ত হয় তবে সপ্তাহে তিনবারের বেশি তার সাথে সাক্ষাতের প্রয়োজন নেই।
 পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন ও তাদের শ্রদ্ধা করুন
 আপনার দু:খ, ক্ষোভ, বেদনায় যারা আপনাকে সমর্থন দেয় তাদের সাথে শেয়ার করুন
 ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রাখুন
 কথাবার্তায় রসিকতা ভাব অব্যাহত রাখুন
 কখনো আশাহত হবেন না
শেষ কথা
১৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে ‘চিকিৎসা নিতে হবে’ এমন রোগী ১৬ লাখ। এই চিকিৎসায় খুব বেশি টাকা-পয়সাও খরচ হয় না। আর চিকিৎসা পদ্ধতিও মোটামুটি নির্ভরযোগ্য। আধুনিক বিজ্ঞানে এই রোগের চিকিৎসায় প্রচুর নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে। আর এগুলো নির্দেশমতো খাওয়াও অত্যন্ত সহজ।
এবারের রচনাটি পড়ে আপনি নিজেও সিজোফেন্সনিয়া রোগটি নির্ণয় করতে পারবেন। আপনার আশপাশেই রয়েছে তারা। যে কোনোভাবেই হোক, তাদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করুন। কারণ ‘পুষে রাখা রোগী’ যে কোনো সময় সামাজিক, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। বিদ্রূপ, টিটকারী করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এরা আমার-আপনার বা অন্য কারো ভাই ও বোন। এদের চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করা আমার-আপনার সামাজিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সম্পর্কে কিছু কথা ডাক্তার বা ফিজিশিয়ান, মনোচিকিৎসক ও আশপাশের পুলিশ কেন্দ্রের ফোন নাম্বার লিখে রাখুন

২. রোগীকে হাসপাতালে স্খানান্তর করতে হবে কি না তা পূর্বেই মনোচিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন

৩. সংকটকালীন বা বিপদের সময় পরিবারের কোন কোন সদস্য এবং বন্ধু কাজে আসতে পারে তা আগেই চিনে নিন

৪. সংকটকালীন অবস্খায় যখন আপনি রোগীর সাথে হাসপাতালে যাবেন সে সময়ের জন্য সবকিছু দেখাশোনা করতে পারে এ রকম কাউকে বাসায় রেখে যান

৫. পুলিশের সহায়তা যদি প্রয়োজনবোধ করেন তবে কোনো দ্বিধায় না ভুগে সরাসরি ফোন করুন এবং রোগীর সাথে অস্ত্র রয়েছে কি না তা পুলিশকে আগেভাগেই অবহিত করুন

৬. সংকটকালীন অবস্খাকে আপনি যতটুকু ভয়ের মনে করছেন প্রকৃতপক্ষে ততটুকু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। 

সংগৃহীত

No comments:

Post a comment