Saturday, 21 December 2013

বাংলাদেশের নারী এবং মানসিক নির্যাতন

বাংলাদেশের নারীরা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন। কিন্তু এসব নির্যাতনের কথা খুব একটা সামনে আসে না। এসব নির্যাতনের জন্য কোনো মামলাও হয় না। মানসিক নির্যাতনের মাত্রাটা এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে অনেক ক্ষেত্রে নারী এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহটাও হারিয়ে ফেলেন। শুধু নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন বা অশিক্ষিত পরিবারগুলোতেই নারীরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন না, এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত নারীরাও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
সম্প্রতি আহছানিয়া মিশন আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রমোশন অব হিউম্যান রাইটস ফর প্রিভেন্টিং ভায়োলেন্স অ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস (পিপিভিডি) প্রকল্পের গবেষণা উত্থাপন করা হয়েছে। তাতে দেখা
গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার। এমনকি যেসব নারী উপার্জন করে সংসারে অবদান রাখছেন, তাঁদের মধ্যে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
প্রিয়াংকা দাস (ছদ্মনাম) পেশায় শিক্ষক। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়। বিয়ের প্রথম প্রথম সব ঠিকঠাক চললেও কিছুদিন পরই টানাপোড়েন শুরু হতে থাকে। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে মতের অমিল হতে থাকে। নিজের অভিজ্ঞতা এভাবেই বলেন তিনি, ‘তাঁরা তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইতেন। পরিবারে আমার মতামতের কোনো দাম ছিল না। আর স্বামীকে এসব ব্যাপার নিয়ে কথা বললেই সে বলত, শিক্ষিত হলেই কি বড়দের কথার অমান্য করতে হয়? আমি বাবা-মায়ের মতের বাইরে যেতে পারব না। স্ত্রৈণ হতে পারব না।
ধীরে ধীরে আমার মনে হতে থাকে এটা আমার পরিবার না। আমি হতাশায় ভুগতে থাকি। দুবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছি। তারপর মনে হলো, এখানে থেকে কিছু হবে না। চলে গেলাম বাবার বাড়ি। সেখানেও আমার এই সিদ্ধান্তকে কেউ স্বাভাবিকভাবে নিলেন না। তাঁরা বললেন, তারা তো তোকে মারধর করে না। কোনো কষ্টও দেয় না। এসব সব সংসারেই হয়। মানিয়ে চল।’
খানিক পর আবার বলেন, ‘আমি তাঁদের বোঝাতে পারছিলাম না যে তাঁরা যে ধরনের ব্যবহার করতেন, সেটা শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও বেশি। বাবা-মা স্বামীর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চাপ দিতে লাগলেন। পাড়া-প্রতিবেশী নানা কথা শোনাতে লাগলেন। বললেন, একবার বিয়ে ভাঙলে মেয়েদের জীবনটাই শেষ! কী আর করব? ফিরে এলাম। এখন তাঁদের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক খারাপ। সহ্য করতে না পারলে একা একা কাঁদি।’
দিপালী তিলোত্তমা (ছদ্মনাম) পেশায় আইনজীবী। তাঁর গল্পটা অন্য রকম। বিয়ে হয়েছিল ডিগ্রি পড়ার সময়। মেয়ের বয়স যখন ছয় মাস, তখন ডিগ্রি পরীক্ষা দেন। স্বামী বলেছিলেন, ‘তুমি মাস্টার্স পড়বে, কারণ আমার অন্য ভাইয়ের বউরা মাস্টার্স পাস। কিন্তু কোনো চাকরি করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম শর্তটা ভালো না লাগলেও পড়তে শুরু করলাম। তারপর মেয়ে যখন একটু বড় হলো, তখন ল পাস করলাম। ল ভর্তির সময় শাশুড়ি অনেক সাহায্য করেছেন। তারপর যখন প্র্যাকটিস শুরু করব, তখনই বাধা দিলেন। নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন যাতে আমি প্র্যাকটিস না করি। প্রথমে মৌখিকভাবে নিষেধ করেছেন। তারপর রাজি হলেন ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট গণ্ডি বেঁধে দিলেন। তাঁদের পরিচিত একজন আইনজীবীর সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে বললেন।
কিন্তু আমার সিনিয়র আইনজীবী এত জনপ্রিয় ছিলেন না। তখন আমি চেম্বার পরিবর্তন করলাম। এর পর থেকেই তাঁরা খোঁজ নিতে শুরু করলেন আমি কী করি, কোথায় যাই। মোট কথা, আমার স্বামী আমাকে সন্দেহ করা শুরু করল। সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়ি চলে গেলাম। বাবা বললেন, বিচ্ছেদ হলে তিনি আমাকে রাখবেন কিন্তু আমার মেয়েকে রাখবেন না।
এদিকে স্বামীও বলছিল, তুমি চলে গেলে যাও। মেয়েকে দেব না। দরকার হলে কোর্টে গিয়ে বলব, তোমার চরিত্র খারাপ। যে মায়ের চরিত্র খারাপ, সে বাচ্চা পায় না। তুমি খারাপ মা। খারাপ মায়ের মেয়ের সঙ্গে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু আমি জানি, আমি না থাকলে মেয়ে ওদের মতো করে মানুষ হবে। ওর কোনো নিজস্বতা থাকবে না। তাই বাবার বাড়ি থেকে আবার ফিরে গেলাম স্বামীর বাড়িতে। তখন মনে হলো, আমি একা। তাই আমার লড়াইটাও একারই।
একদিন আমার পেশা ছেড়ে দেওয়ার জন্য স্বামীর সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া হলো। তখন হাইকোর্টে যাচ্ছিলাম। তখনই শাশুড়ির কাছে গিয়ে বললাম, আপনি কী বলেন, আমি কি ছেড়ে দেব চাকরি? আপনি বললে ছেড়ে দেব। সেই মুহূর্তে শাশুড়ি পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
কিন্তু আমার স্বামী কখনো মন থেকে আমার প্র্যাকটিস করাটা মেনে নেয়নি। বাড়িতে বাজে বাজে কথা বলে অপমান করে। কোর্টে সহকর্মীদের কাছে আমার ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়। এটা তো খুবই অপমানজনক।
আজ ১৩ বছর ধরে কাজ করছি। এখন পর্যন্ত অপমান সহ্য করতেই হচ্ছে। আজও যদি বলি, আমার ওকালতি ছেড়ে দেব, আমার স্বামী সবচেয়ে বেশি সুখী হবে।’
এ রকম মানসিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে পরিবারগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায় মানসিক নির্যাতন। নারীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় পরিবেশ-পরিস্থিতি। কিন্তু মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে এখনো জনগণ সচেতন নয়। তাই নারীর প্রতি মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে যেসব আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে এবং এ ধরনের মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে হবে।। তাহলেই হয়তো আকলিমা, প্রিয়াংকা আর দিপালীরা নিরাপদ আর সুস্থ জীবন যাপন করতে পারবেন। আর তা নইলে তারা আত্মঘাতির মতো ঘটনাতে আত্মাহুতি দেবে
প্রথম আলো সংকলিত

No comments:

Post a comment