Friday, 28 March 2014

‘আত্মহত্যা করতে পারে রানা প্লাজার আরো অনেক শ্রমিক’

সাভারের বহুতল ভবন ‘রানা প্লাজা’ ধসে মারা যায় কয়েক হাজার মানুষ। চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান অনেকে। যারা বেঁচে আছেন তারাও ভুগছেন ‘সাইকো সোমাটিক ট্রমা’ বা মানসিক কারণে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায়। বেসরকারি সংস্থা কারিতাস জানিয়েছে, বেঁচে যাওয়া এই শ্রমিকদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি। 

রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকেরা আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে সালমা নামে একজন আহত শ্রমিক তুরাগে এবং ভবনধসের উদ্ধারকর্মী ওমর ফারুক বাবু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আত্মহত্যা করেছেন। সামনের
দিনগুলোতে আহত শ্রমিকদের আরো অনেকে আত্মহত্যা করতে পারেন বলেই মনে করছে আহত শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ‘কারিতাস’। 

রানা প্লাজার আহত শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনদের নিয়ে প্রায় ১০ মাস কাজ করার পর এ ধরনের আশঙ্কার কথা বলছে কারিতাস। দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে শ্রমিকদের সাইকো সোশ্যাল থেরাপি (মনো-সামাজিক চিকিৎসা) প্রদান করছে বেসরকারি এই সংগঠন। 

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ঢাকার আঞ্চলিক পরিচালক রঞ্জন ফ্রান্সিস রোজারিও বলছেন, ‘রানা প্লাজা থেকে বেঁচে আসা শ্রমিকেরা ‘এইচআইভি এইডসের’ মতো দূরারোগ্য মানসিক ব্যধিতে ভুগছেন। তাদের প্রায় সবাই এখনো রাতের বেলা বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে পারছেন না।’ 

পোশাক শ্রমিকদের মাঝে বিরাজ করছে ‘সাইকো সোমাটিক ট্রমা’ বা মানসিক কারণে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা। এছাড়াও আহত শ্রমিকরা তীব্র ভয়, অন্ধকার এবং শব্দ ভীতি, দুঃস্বপ্ন, নিদ্রাহীনতা, অবসাদ, অস্থিরতা এবং অপরাধবোধের মতো মানসিক রোগে ভুগছেন। সবকিছু মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে এইসব শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে বলেই মনে করেন কারিতাসের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর দেওয়ান সাফায়েত আহমেদ। 

শাপলা খাতুন রানা প্লাজার সপ্তম তলায় ফ্যান্টম টেক গার্মেন্টেসে কাজ করতেন। ভবনধসে শাপলা নিজে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ভাইকে হারিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘মেডিক্যাল থেকে ফিরে অনেক ঘুরছি। রানা প্লাজা শুনে কেউ কাজ দিতে চায় না। বাড়িতে বাবা অন্ধ, ভাইয়ের তিনটি সন্তান। আমি এখন বাসাবাড়িতে কাজ করে খাই।’ 

অন্যদিকে কারিতাসের রঞ্জন ফ্রান্সিস রোজারি জানান, রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকরা অন্যান্য পোশাক মালিকদের অলিখিত হুকুমের কারণে অন্য কোথাও চাকরি পাচ্ছেন না। কারণ এই শ্রমিকেরা অন্য পোশাক কারখানায় কাজ করতে গিয়ে সামান্য শব্দে মূর্ছা গিয়ে অন্য শ্রমিকদের আতঙ্কিত করেছেন। এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার পর রানা প্লাজা ‘ফেরত’ শ্রমিকদের জন্য অন্য পোশাক কারখানাগুলোর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। 

দেওয়ান সাফায়েত আহমেদ বলেন, ‘শ্রমিকেরা ঢাকা বা সাভারের বাসা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতেও পারছেন না। কারণ রানা প্লাজা ধসের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও ক্ষতিপূরণ দিতে আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রস্তুত হয় নি। তালিকায় নাম লেখাতে এক রকম বাধ্য হয়েই শ্রমিকেরা বাস করছেন সাভারের বেশ কিছু এলাকায়।’ 

তিনি আরো জানান, শ্রমিকদের অধিকাংশ বর্তমানে বাস করছেন সাভারের মজিদপুর, ইমান্দিপুর, ভাটপাড়া, ডগরমুড়া, আড়পাড়া, বাড্ডা, ব্যাংক কলোনি এলাকায়। 

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধারকাজে অংশ নেয় কারিতাস। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিতাসের একটি সম্মিলিত মনো-সামাজিক বিশেষজ্ঞ দল মাসব্যাপী এনাম মেডিক্যাল, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি), সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে গিয়ে আহতদের কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করে। এ সময় মোট ৯৮৮ জন আহত শ্রমিক ও ৩২১ জন নিহতের স্বজনকে মানসিক সহায়তা সেবা দেয়া হয়। পরবর্তীতে কারিতাসের পক্ষ থেকে আহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং দলবদ্ধভাবে কাউন্সিলিং সেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। 

সম্মিলিত মনো-সামাজিক বিশেষজ্ঞ দলে প্রথম থেকেই কাজ করে আসছেন সাফায়েত আহমেদ। তার ভাষ্য, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুই বছর মেয়াদি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রকল্পের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক। কিন্তু শ্রমিকদের যেমন যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় নি, তেমনি এই প্রতিশ্র“তিও পরবর্তীতে ভুলে যাওয়া হয়েছে।’ 

বেসরকারি পর্যায় থেকে দেয়া সেবা যথেষ্ঠ কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাফায়েত বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আপনাকে আমাদের জনবল ও অর্থবলের অপ্রতুলতার দিকটিও দেখতে হবে।’ 

প্রসঙ্গত, আত্মহত্যাকারী পোশাক শ্রমিক সালমা (২৭) ঢাকার তুরাগ থানার বামনার টেক এলাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। চলতি বছরের জানুয়ারির পুলিশ তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। 

তুরাগ থানার এস আই কামাল হোসেন বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সালমা মাথায় আঘাত পেয়েছিল বলে তার স্বামী বাবু আমাদের জানিয়েছেন। তার মাথায় প্রায়ই প্রচ- যন্ত্রণা হতো। প্রতিবেশীরাও আমাদের একই কথা বলেছে। ওই যন্ত্রণা সইতে না পেরেই সালমা ঘরের আঁড়ায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’ সালমা রানা প্লাজার সপ্তম তলায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। 

অন্যদিকে রানা প্লাজায় উদ্ধারকর্মী ওমর ফারুক বাবু পরবর্তীতে মানসিক ভারসাম্য হারান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার তিন দিনের মাথায় বাবুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধার করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন বাবু। ওবি নেট

No comments:

Post a comment