Monday, 19 November 2012

আত্মহত্যা ঝুঁকিতে টিনেজ কিশোর-কিশোরীরা


ভালবাসা পাল্টে দেয় মানুষের ভুবন। যেমনটা পাল্টে দিয়েছিল নূপুর আক্তার শিলা (১৭)কে। ভালবাসার টানে মা-বাবা, পরিবার সব কিছুকে পেছনে ফেলে ঘর ছেড়েছিল সে। কিন্তু  ক’দিন পরই বুঝতে পারে প্রেমিক সাকিব প্রতারণা করেছে তার সঙ্গে। তখন আর ফেরার চেষ্টা করেনি এ তরুণী। আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। শিলার মতো হাজারো তরুণ-তরুণী, নানান বয়সী মানব-মানবী প্রতিদিন আত্মহত্যা করছে। ভালবাসার মানুষের প্রতারণা ছাড়াও নানান কারণে আত্মহত্যা করে তারা। 


যখন এক কিশোরী প্রেমে পড়ে তখন সে প্রেম হিমালয়ের চূড়ার মতো উঁচু হয়ে যায়। সেই মুখ ছাড়া অন্য কোন কিছু বোঝে না সে। আর তখন  পরিবারের কেউ তাতে বাধা দিলে সেই ব্যক্তি হয়ে যায় চরম শত্রু। অন্য কোন পথে না গিয়ে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে জানা যায়, শুধু সম্পর্কের বিচ্ছেদের কারণেই নয় তারুণ্যের জোয়ার, অবিবাহিতা অবস্থায় গর্ভবতী হওয়া, ব্যক্তিত্ববোধ, কোন কাজে হেরে যাওয়া, পরীক্ষায় খারাপ করা, এসব কারণে হতাশা থেকে বিষণ্নতা গ্রাস করে ব্যথিত হৃদয়। গুরুতর বিষণ্নতা টেনে নেয় আত্মহননের পথে। এসব কারণে বিশ্বে বছরে ৪০ লাখ লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তবে সফল হয় ১ লাখ। 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর শাহিন ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে টিনেজাররা। তাদের বয়সটা হচ্ছে সবদিক থেকে বাড়ন্ত সময়। এ সময় তারা অল্পতেই রেগে যায়। তাদের মধ্যে উত্তেজনা কাজ করে বেশি। সম্পর্কে বিচ্ছেদের কারণেই তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাটা বেশি বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন। গ্রাম এলাকা ও শহর এলাকায় আলাদাভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গ্রামের মেয়েদের বেশির ভাগই যৌতুকের কারণে, বিয়ে বারবার ভেঙে যাওয়ার কারণে, ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে, অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়ে কাউকে বলতে না পেরে হতাশা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। 
গৃহবধূদের আত্মহত্যার হারও দিন দিন বাড়ছে। 


পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব থেকে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ গলায় ফাঁস দিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশের প্রজননক্ষম বিবাহিত নারীদের মধ্যে শহরের ১৪ শতাংশ ও গ্রামের ১১ শতাংশ নারী আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। এদের মধ্যে শহরের ২৬ শতাংশ ও গ্রামের ৯ শতাংশ নারী আত্মহত্যা করে। প্রজননক্ষম নারীদের শতকরা ৪০ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বিবাহিত জীবনে যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শহরের ৪৪ শতাংশ ও গ্রামের ৩১ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার হন (আইসিডিডিআর,বি ২০১০)।  
এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাংসারিক অশান্তি, পরকীয়া, মাদকসেবন ও বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে বাড়ছে আত্মহত্যার হার।  মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছরই আত্মহত্যার হার বাড়ছে। পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে আত্মহত্যা করে ৩২৭ জন। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪১ জনে। ২০১১ সালে আরও বেড়ে ৪৪৯ জনে দাঁড়ায়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আত্মহননের পথ বেছে নেয় ৩৪৮ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের কাছে ৫১১৪ জনের লাশ পাঠানো হয়। এদের মধ্যে ৯৭০ জনেরই মৃত্যু হয়েছে আত্মহত্যার কারণে।


মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, মুড বা সার্বক্ষণিক আবেগীয় অবস্থা বা মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক পদার্থ, নিউরোট্রান্সমিটারের গোপন সংশ্রব। এ পদার্থগুলোর মধ্যে সেরোটোনিক ও নরএড্রিনালিনের মাত্রা কমে গেলে মনোজগতে তৈরি হয় নিম্নচাপ। নিম্নচাপ থেকে আসে বিষণ্নতা। গুরুতর বিষণ্নতা থেকেই প্রবণতা বাড়ে আত্মহত্যার। সামপ্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয় পারিবারিক অসচেতনতা এবং কাউন্সেলিং-এর অভাব। 

যদি ছেলেবেলা থেকেই পরিবার থেকে তার ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতন করে তোলা হয় তাহলে তার মধ্যে রাগ জেদ অনৈতিক আবদার থাকবে না। চিন্তা-ভাবনা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে তারা। শারীরিক দুর্বলতা, ঘুম কম হওয়া, মোবাইল ও ইন্টারনেটের অধিক ব্যবহারও আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন। এর প্রবণতা কমাতে হলে সবাইকে কাউন্সেলিং-বা থেরাপীর  ভিতরে আনতে হবে। 

সৌজন্যেঃ মানবজমিন

No comments:

Post a comment