Wednesday, 3 September 2014

দিনে ২৮ আত্মহত্যা

বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। শুধু গত বছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১০ হাজার ১২৯ জন। এ তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের। যাঁরা আত্মহত্যা করেছেন বা চেষ্টা করেছেন, তাঁদের বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
আত্মহত্যা নিয়ে গোটা বিশ্বে উদ্বেগ আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ১৫-৪৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। গত বছর ডব্লিউএইচও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন। আত্মহত্যার চেষ্টা
চালাবেন এরও ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।
মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর সবচেয়ে কর্মক্ষম বা উৎপাদনশীল বয়সে বহু মানুষ আত্মহত্যা করলেও সমস্যা সমাধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। এ সমস্যার পরিসর যে এতটা, তা নিয়েও খুব বেশি মাথাব্যথা নেই নীতিনির্ধারকদের। আত্মহত্যার প্রবণতা আছে এমন মানুষের চিকিৎসাসেবার সুযোগও অপর্যাপ্ত। 
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন সেবার অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। মানসিক রোগের চিকিৎসায় সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে, যদিও এখন পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এম এম আকাশ বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ২১-৩০ বছর বয়সী গোষ্ঠী সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। এ বয়সীদের এই হারে আত্মহত্যার অর্থ হলো, দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে কর্মক্ষম মানুষগুলোর সেবা থেকে বঞ্চিত হলো।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষকেরা বলছেন, একসময় উন্নত দেশের মাথাব্যথার কারণ হলেও, এখন মধ্যম আয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও আত্মহত্যার প্রবণতা ও সংখ্যা বাড়ছে। 
শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বে প্রধানত নিঃসঙ্গতা থেকে বৃদ্ধরা এবং বিশেষত পুরুষেরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করছেন ২১-৩০ বছর বয়সীরা। এর মধ্যে আবার নারীর সংখ্যা বেশি। 
বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে, প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। এর বাইরে আছে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়া, রেললাইনে ঝাঁপ দেওয়া। তবে কীভাবে, কতজন আত্মহত্যা করেন, তার পরিসংখ্যান আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। 
এই হিসাবমতে, এর বাইরে দেশের বড় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যত রোগী ভর্তি হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ ভাগ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া লোকজন।
গত এক বছরে প্রথম আলোয় প্রকাশিত ২০টি আত্মহত্যার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যৌতুকের কারণে নারী আত্মহত্যা করেছেন, স্বামী মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে সন্তানকে হত্যা করে মা আত্মঘাতী হয়েছেন। স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়ে লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করেছে। অন্তত দুজন রোগের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে, অন্যজন মতিঝিল এজিবি কলোনিতে শ্বাসকষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের গলা কেটে ফেলেন। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়ায় নীলফামারীতে এক কিশোর আত্মহত্যা করে। শুধু এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনই আত্মহত্যার চেষ্টা করা কমপক্ষে ২৭ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হন। এঁদের মধ্যে মারাও যান একজন। 
গত ১৯ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় সাত মাসে আত্মহত্যা ১২, চেষ্টা ৯৮ জনের’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। এত দিন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্রে দেখা গেছে, কেবল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। কিন্তু এই প্রতিবেদনটির মাধ্যমে নতুন আরেকটি এলাকার ভয়াবহতা প্রকাশ পেল। 
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ ২০০৮-০৯ সালে ৯৭০টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতন বেড়েছে, ইভ টিজিংয়ের মতো ঘটনা ঘটছে ব্যাপকভাবে। অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হওয়া, অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর গর্ভধারণের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করেন। বেশির ভাগ নারী আত্মহত্যা করেছেন গলায় দড়ি দিয়ে, আর পুরুষেরা কীটনাশক খেয়ে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, যাঁরা আত্মহত্যা করেন তাঁদের ৯৫ ভাগই কোনো না-কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। 
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ সময় যাঁরা আত্মহত্যা করেন, তাঁরা ধারাবাহিকভাবে গুরুতর বিষণ্নতায় ভোগেন। ঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এঁদের বাঁচানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল।
সরকারি হিসাবে, সাড়ে ১৫ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০। জেলা পর্যায়েই মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শুধু ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা হয়। পুরোনো আটটি মেডিকেল কলেজের একটিতেও এ বিষয়ের অধ্যাপক নেই। 

প্রথম আলো

No comments:

Post a comment