Friday, 17 October 2014

গত তিন বছরে আত্মহত্যা ৩০,০০০

 ‘আম্মু-আব্বু আমাকে মাফ করে দিও। আমি অন্যায় করেছি, আমার সাজা হওয়া উচিত। আমি আর কোন কিছু সহ্য করতে পারছি না। খুব অসহায় লাগছে। তুমিই তো বলো আমার মতো  মেয়ের দরকার নেই। আমি এভাবে তোমাদের কষ্ট দিতে চাই না। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি এই জীবন সহ্য করতে পারছি না। আমি একজনকে ভালবাসি। আমি খারাপ, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তাই আমি চলে গেলাম ...।’ হৃদয়বিদারক এই সুইসাইড নোটটি  রাজধানীর ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্রী নাঈমা বিনতে নাহিদের। আত্মহত্যার আগে সে লিখেছিল এই লেখাটি। এরপরই কলেজের হোস্টেল কক্ষের সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করে সে। ১৫ই আগস্ট রাতে গুলশান থানা পুলিশ কলেজ হোস্টেলের কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ ও নাঈমার বন্ধুরা জানান, তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বাবু নামে এক সহপাঠীর। বিষয়টি নাঈমার মা-বাবা জেনে ক্ষুব্ধ হন তার প্রতি। ঈদের ছুটি কাটিয়ে গত ৮ই আগস্ট কেশবপুরের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার আগে নাঈমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন তারা। অন্যদিকে নাঈমার প্রেমিক বাবু তার সঙ্গে
প্রতারণা করে। তারই সহপাঠীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোল। মানসিক এই চাপ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় নাঈমা। শুধু নাঈমা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণই হচ্ছে আত্মহত্যা। দেশে প্রতি ঘণ্টায় একজন আত্মহত্যা করছেন। আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত তিন বছরে প্রায় ৩০,০০০ লোক আত্মহত্যা করেছেন। খোদ রাজধানীতে প্রতিদিন দুই থেকে তিন জন আত্মহত্যা করছেন।
সমপ্রতি বহুল আলোচিত আত্মহত্যার ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের গরীবে নেওয়াজ সড়কে ১১ নম্বর বাসায়। ইংলিশ মিডিয়ামে অধ্যয়নরত ভাই-বোনের আত্মহত্যার নির্মম ঘটনাটি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিশোর-যুবরাই বেশি আত্মহত্যা করছেন। এর মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছেন। গত ২২শে জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে সুইসাইড নোট লিখে সালমা ইসলাম দিলু (৪০) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেন। তার স্বামীর নাম নেসারুল ইসলাম। ধানমন্ডির ৯/এ হাউজের রাস্তার পাশ থেকে সালমার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় নিহতের বাড়ি  থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমি প্রেম করে বিয়ে করলাম, কিন্তু আমার ভাইয়েরা মেনে নিলো না। আমার বোন আমার কাছে ৫ লাখ টাকা পায়। টাকাগুলো দিয়ে দিবেন।’ পুলিশ নিহতের পরিবারের বরাত দিয়ে জানায়, এটি ছিল সালমার দ্বিতীয় বিয়ে। তার একটি কন্যা সন্তান আছে। কয়েক মাস ধরে স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিবাদকে কেন্দ্র করে পৃথকভাবে বসবাস করছিলেন সালমা। পরিবারের অমতে দ্বিতীয় বিয়ে করায় এবং স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের ফলে তিনি তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন। মৃত্যুর আগে সালমা ২০টি ঘুমের ওষুধ সেবন করেন।  
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অপ্রাপ্তি, প্রতারণা, হতাশা, মাদক, মানসিক অবসাদ, পারিবারিক নির্যাতন, ইভটিজিং ও অতিরিক্ত আবেগ প্রবণতার কারণেই বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এ জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা। আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। গত দুই মাসে রাজধানী ঢাকা শহরে আত্মহত্যা করেছেন ৮৩ জন। গত আগস্ট মাসে আত্মহত্যা করেছেন ৩৯ জন। এরমধ্যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ৩০, বিষপান করে সাত এবং গায়ে আগুন দিয়ে দু’জন আত্মহত্যা করেছেন। তার আগে জুলাই মাসে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। এর মধ্যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ৩৭, বিষপান করে পাঁচ,  গায়ে আগুন দিয়ে দু’জন আত্মহত্যা করেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৬,৪৯২ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত বছর ১০,১২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০,১০৫। ২০১১ সালে আত্মহত্যা করেন ৯৬৩২ জন। ঢাকা শহরে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাইদুর রহমান বলেন, অনেক  ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরে বিষপান বা গলায় দড়ি  দেয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। তখন ঢাকায় মারা গেলে সংশ্লিষ্ট থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। সে হিসাবে ঢাকায় অপমৃত্যুর মামলার সংখ্যা বেশি বলে তিনি জানান।
গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আত্মহত্যার পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার ৭৫ ভাগই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আমাদের দেশেও আর্থিক দৈন্য, মানসিক চাপ আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। শহরের তুলনায় গ্রামে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭ ভাগ বেশি। আত্মহত্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। যা ২০১১ সালে ছিল ৩৮তম। বিশ্বের প্রায় সব দেশে নারীর তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি আত্মহত্যা করে পুরুষরা। কিন্তু বাংলাদেশে আত্মহত্যাকারীদের ৬০ ভাগই নারী। এ দেশে নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন। বেশির ভাগ নারীই আর্থিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এসব কারণেই তারা পুরুষের তুলনায় বেশি মানসিক চাপের শিকার হন। এ কারণে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি। 


রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, মানসিক চাপ, অপ্রাপ্তি, মাদক ও আবেগপ্রবণতার কারণেই আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বয়ঃসন্ধিকালে আবেগ বেশি থাকে। ওই সময়ে কোন অপ্রাপ্তিই তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। এ থেকে মানসিক যে চাপ সৃষ্টি হয় তা সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। আত্মহত্যার প্রবণতার প্রতিকার সম্পর্কে তিনি বলেন, চাইলেই সব পাওয়া যায় না। অপ্রাপ্তিটাকে সহজে গ্রহণ করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। যেমন, খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা জয় অনুভব করি আবার পরাজয়টাও গ্রহণ করি। এটি বাস্তব জীবনের একটি রিহার্সাল। এই শিক্ষার জন্য পারিবারিক সচেতনতা প্রয়োজন। এছাড়াও, অভিভাবকদের উদাসীনতা বা জেনারেশন গ্যাপ, পারিবারিক কলহ, সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, জুয়া, দীর্ঘমেয়াদি পীড়াদায়ক রোগ অনেক সময় আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকসেবীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি। বিশেষ করে হিরোইন ও ইয়াবা সেবনে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিলে দ্রুত কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। 

আত্মহত্যার প্রবণতা চেনার উপায় সম্পর্কে ডা. আখতারুজ্জামান জানান, কথায় বা লেখায় জীবনের প্রতি অনীহা প্রকাশ, সীমাহীন কষ্টের কথা প্রকাশ করা, হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, অকারণে কাঁদা, নিজেকে গুটিয়ে রাখা, অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমের প্যাটার্নে দৃশ্যমান অস্বাভাবিক পরিবর্তন, নিজেকে অন্যের বোঝা মনে করা, পরিচিতজনদের নিকট  থেকে বিদায় নেয়ার সময়- এটাই হয়তো শেষ দেখা, চিরবিদায় ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করা, মৃত্যু বিষয়ে নানা চিন্তা-ভাবনা, হঠাৎ অন্যদের উপদেশ ও দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া, আত্মহত্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন জিনিস সংগ্রহ করা, অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন, মাদকাসক্তদের মাদক সেবনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া আত্মহত্যার লক্ষণ হতে পারে।  

কৃতজ্ঞতাঃ মানবজমিন

No comments:

Post a comment