Wednesday, 10 June 2015

প্যারাসুইসাইড, কৈশোরের আবেগ জনিত আত্মহত্যা

 
টিন এইজ ছেলে-মেয়ে গুলো আত্মহত্যা করছে কেন ? তাদের উপর তো এত দায়িত্ব নেই, তাহলে? উত্তরটা হচ্ছে, তাদের মানসিকতার উপর এমনই এক পাহাড় সমান দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে যে তাদের পক্ষে এটা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবারের বাবা-মা সবসময় সন্তানদের সাথে ধমকের দিয়ে কথা বলেন,  অবহেলা করেন। ফলে, পরীক্ষায় খারাপ করলে কি হবে, সন্তানরা সেটা ভাবতেও পারে না। পাড়া-প্রতিবেশী,বন্ধু-বান্ধব,সবাই উপহাস করবে, হাসবে, গোটা পৃথিবীর সবকিছুই তখন শত্রু হয়ে যাবে, সে কোন ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না, পৃথিবীর সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়বে তার মাথার ‍উপর- কি অসহনীয় মানসিক চাপ! ১৪-১৫ বছরের একটি কিশোর বা কিশোরীর পক্ষে আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এই পরিমান চাপ কি যথেষ্ট নয়? 
 টিন এজারদের মধ্যে এই আত্মহত্যা প্রবণতার নাম হচ্ছে  ‘প্যারাসুইসাইড’।  ক্লাস এইট বা টেন, এই সময়টা
বয়ঃসন্ধির সময়।এই সময় একজন ছেলে বা মেয়ের শারীরিক এবং মানসিক  সব রকম পরিবর্তন হয়। এসময় তাদের মধ্যে দৈহিক ও  মানসিকতার পরিবর্তন আসে।তাদের মাঝে অতৃপ্ততা এবং প্রবল আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে।
মনে আছে, আমার ১৩ বছর বয়সের সময় আব্বা মারা যাওয়ার পর কৈশোরে আমাকে আমার ভাইবোন সবাই অবহেলা করতো । ভাইয়েরা মাকে সবসময়  আমার বিরুদ্ধে বলতো। মাকে আমার বিরুদ্ধে সত্য মিথ্যা বানিয়ে বলতো। কেন বলতো, সে প্রসঙ্গে পরে লিখবো। আর  একারণেই এই অবহেলা থেকে বাঁচার জন্য  সারাদিন বাসার  বাইরে থাকতাম। সবার উপর অভিমান করে থাকতাম। ভাইবোনের অবহেলায় বাসায় কারো সাথে আমি যেমন কথা বলতাম না, তেমনই  তারাও আমার সাথে কথা বলতো না। আমাকে এড়িয়ে যেতো। কতদিন আত্মহত্যার কথা মনে হয়েছে তার কোন হিসাব নাই ! আসলে এই সময়টাই এমন। বাবা-মা এবং ভাইবোনদের খুব সাবধানী হয়ে এই সময়টা  পরিচালনা করতে হয়। বাবা-মা যদি এই সময়ে তাদের সন্তানদের বুঝতে না পারেন, তার থেকে খারাপ আর দুঃখজনক ঘটনা আর একটিও হতে পারে না। 
বাংলাদেশে প্রতিদিন আত্মহত্যা করছে গড়ে প্রায় ২৮ জন! আত্মহত্যা মানেই ক্ষতি। তবে সবথেকে বড় ক্ষতি হয় যখন কোন কিশোর বা কিশোরী অভিমান করে আত্মহত্যা করে। যার সারা জীবনটাই বাকি থেকে গেল, সেই জীবনে কি আছে না আছে, এসব না জেনেই, দেশ ও দশের জন্য কিছু না করেই যে ছোট্ট প্রাণ চলে গেল, সে কষ্ট রাখার মত কোন জায়গা পৃথিবীতে নেই। কিন্তু আত্মহত্যা কোন কিছুরই সমাধান নয়। 

বাবা  মায়েরা সন্তানের বয়ঃসন্ধির সময়টাতে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অনেক ভয়ে থাকেন।  এই বুঝি তারা বখে গেল, এই বুঝি তারা খারাপ সঙ্গে জড়িয়ে গেল, এই বুঝি তারা মাদক সেবন শুরু করল!  যেটা খুবই প্রয়োজন তা হল, স্কুলের বই-পত্রের পাশাপাশি আপনার সন্তানের সাথে সব কিছু শেয়ার করুন। মজার মজার গল্প করুন। যাতে সে কখনও জীবনের প্রতি হতাশ না হতে পারে ! যাতে করে আত্মহত্যার মত কোন চিন্তা তার মাথায় না আসে।  
প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে সাফল্যে হাসবে, আর একই বয়সী কিছু ছেলে-মেয়ে না ফেরার দেশে চলে যাবে, এমন ঘটনা আমরা আর দেখতে চাই না। তার জন্য আমাদের যা করা দরকার,তাই করতে হবে, যতসব ব্যবস্থা নেয়া দরকার, সব নিতে হবে। একবার ভেবে দেখুন , আইনস্টাইন যদি পরীক্ষায় ফেল করে মনের কষ্টে আত্মহত্যা করে বসতেন, তাহলে আমাদের সবার কি হত, আমরা আজও কত শত বছর পিছিয়ে থাকতাম!  আজ যে ছেলেটি আত্মহত্যা করল, হয়ত সে ছেলেটিই একদিন গোটা দেশের ভাগ্য বদলিয়ে দিতে পারতো !  তাহলে আমরা কতটা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলাম? এ আমাদের দুর্ভাগ্য, এ আমাদের  ক্ষতি ।। 

সংকলিত

No comments:

Post a comment