Sunday, 12 July 2015

‘নার্সিসিজম’ – আমাদের আশেপাশে অনেকেই আক্রান্ত

নার্সিসিজম রোগের কেতাবি নাম `নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজওর্ডার’ বা ‘এনপিডি’।বাংলায় বলা যেতে পারে ‘অতি আত্ম-প্রেম জনিত ব্যক্তির আচরণ বিচ্যুতি’। এটিকে শুধু রোগ নয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।তবে নিজের প্রতি সম্মানবোধ বা নিজের পারদর্শীতার উপর আস্থা কিংবা নিজের অর্জনের প্রতি ভালোবাসাজনিত সাধারণ যে অহম, যা প্রত্যেকেরই থাকে এবং থাকা উচিৎ, তা কিন্তু নার্সিসিজম তথা এনপিডি নয়। 
নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজওর্ডার (এনপিডি)-এ আক্রান্তদের মধ্যে নিচের সবগুলো বা বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়ঃ
  • সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আত্মকেন্দ্রিকতা
  • সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা
  • মনস্তাত্বিক সচেতনতার অভাব 
  • অন্যের অনুভূতির বিষয়ে ধারণার অভাব
  • নিজেকে অন্যের তুলনায় সর্বদা উচ্চতর অবস্থানে দেখা
  • যেকোন অবমাননা বা কল্পিত অবমাননার প্রতি অতি সংবেদনশীলতা
  • অপরাধবোধ নেই 
  • অসৌজন্যমূলক, যুক্তিহীন কথা বলা 
  • নিজের প্রশংসাকারীদেরকে তোষামোদ করা
  • নিজের সমালোচকদেরকে ঘৃণা করা
  • অন্যদেরকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেয়া বা স্বার্থ উদ্ধার করা 
  • আসলে যতোটা না, তার চেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবা
  • নিজেকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে উপস্থাপন করা
  • নিজেকে বহু বিষয়ের পণ্ডিত মনে করা
  • অন্যের দৃষ্টিকোণে বাস্তব পৃথিবী কেমন তা বুঝতে না পারা 
  • অনুতাপ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অস্বীকৃতি,অনীহা  
 মার্কিন মনোচিকিৎসক এবং মনোবিশ্লেষক ডক্টর স্যান্ডি হচ্‌কিস-এর মতে একজন নার্সিসিস্ট-এর সাত ধরণের আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যেগুলোকে তিনি ‘ডেড্‌লি সিন্‌স’ বা ভয়াবহ পাপ নামে অভিহিত করেছেন। এগুলো হলোঃ
  • লজ্জাশূণ্যতা
  • অধিভৌতিক ভাবনা
  • ঔদ্ধত্য
  • হিংসা
  • বশ্যতার উচ্চাভিলাস
  • ঠকবাজি
  • সীমাহীন অধিকারবোধ 
‘হেল্‌দি নার্সিসিজম’ 
হেল্‌দি নার্সিসিজম হলো নিজের সত্তার এক সত্য বা সত্যোপলব্ধি, নিজের প্রতি নিজের এবং অন্য বস্তুর আনুগত্য অর্জন, সত্তার স্বাভাবিকতা এবং পরম অহংবোধের সুসংহত অবস্থা, এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা ও উম্মত্ততার মধ্যে বিরাজমান ভারসাম্য। এটি ব্যক্তির মাঝে এক ধরণের অপরিবর্তনীয়, বাস্তবধর্মী স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা এবং পরিণত লক্ষ্য ও বিশ্বাস আর সেই সাথে বস্তু-কেন্দ্রিক সম্পর্ক গঠনের সক্ষমতা তৈরি করে। এটা অনেকটা অনিরাপত্তা ও অপর্যাপ্ততা প্রতিরোধী একধরণের আত্মবিশ্বাস। মানুষের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বিকাশে হেল্‌দি নার্সিসিজম অত্যাবশ্যকীয়। এতে আত্মপ্রেম অবশ্যই আছে তবে তা চারপাশের বাস্তবতাকে লীন করে এককেন্দ্রিকতা দেয়না। তাই এটি রোগের কোনো লক্ষণ নয়। এটি মানসিক সুস্বাস্থের সহায়ক।

নার্সিসিজ্‌ম
নার্সিসিজ্‌ম’ বলতে আত্মমগ্নতার এক বিশেষ প্রকাশকে বুঝায়। এটা সাধারণত বন্ধু-বান্ধব, নিকট আত্নীয়-স্বজনদের মাঝে কথা বলার সময় এই আচরণ খুব সহজে পড়ে। একজন নার্সিসিস সাধারণত কারও সাফল্য কিংবা আনন্দের গল্প শুনতে আগ্রহী নন, বরং অন্যের কথা বলার সময় নিজেরটা চাপিয়ে দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেন। অন্যের কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শোনার জন্য ভীষণ ব্যাকুলতা থাকেন তিনি, এবং প্রশংসাকারী ব্যাতীত অন্য কারো গুণের কথা সাধারণত তিনি স্বীকার করেননা এবং তাদের সাথে তার সখ্যও হয়না। নিজের প্রাপ্তি আর সম্ভাবনার কথা প্রচার করতে এ ধরণের রোগী এতো মরিয়া হয়ে উঠেন আর বিষয় বর্ণনায় এতো অতিরঞ্জন করে থাকেন যে অন্যেরা বিরক্ত হতে বাধ্য হন। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, আইনজীবি, পরিবারের বহু সন্তানের মধ্যে প্রথম বা দ্বিতীয়টির মাঝে এই ধরণের প্রবণতা সহজেই চোখে পড়ে। 
সমালোচনাকারী আর শত্রু এদের কাছে সমান। এরা আত্মসমালোচনা করতে অপারগ। স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কোনো কিছুকে বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে এরা সবার অলক্ষ্যে অনেকটা প্রতিবন্ধী হয়ে সমাজে বাস করতে থাকেন, বিনা চিকিৎসায়।

নার্সিসিস্টিক প্যারেন্ট্‌স
‘নার্কাস্টিক এ্যবিউজ’ যা দ্বারা শিশুদের উপর বাবা-মা কর্তৃক একধরণের মানসিক নির্যাতনকে বুঝায়। এ ধরণের বাবা-মা হলেন ‘নার্সিসিস্টিক প্যারেন্ট্‌স, যারা সন্তানের ইচ্ছের বিকাশকে রুদ্ধ করে নিজেদের সম্মান বৃদ্ধির প্রয়োজনে, কিংবা নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছাকে সন্তানের ভেতর বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। বাবা-মা নিজেদের স্বপ্নের স্বাদ ঘোলে মেটানোর আশায় তারা সন্তানের উপর চাপিয়ে দেন । এর ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরণের বাবা-মার সাথে শীঘ্রই সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়, আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো সন্তানের ভেতর আত্নহননের প্রবণতা তৈরির সম্ভাবনাও কম নয়।


কর্পোরেট নার্সিসিজম
কর্মক্ষেত্রেও নার্সিসিজমের উপস্থিতি লক্ষনীয়, যা কর্মচারী এবং মালিক উভয়ের মাঝেই থাকতে পারে। একে বলা হয় কর্পোরেট নার্সিসিজম। যে মালিকের কাছে প্রফিট-ই একমাত্র লক্ষ্য, কিন্তু কর্মচারীর সুবিধা-অসুবিধা, স্বাস্থ্য এবং ঝুঁকির বিষয়টি কখনোই তার মাথায় আসেনা—তিনি আসলে নার্সিসিজমের শিকার। মালিক রোগীর এধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা স্বল্পমেয়াদে বেশ সুবিধা বয়ে আনলেও আখেরে প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

সেক্সুয়্যাল নার্সিসিজ্‌ম
‘সেক্সুয়্যাল নার্সিসিজ্‌ম’ বলতে নিজের যৌনতা কিংবা প্রেমিক-সত্তার সক্ষমতাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সব সময় নিজেকে কল্পনা করার প্রবণতাকে বুঝায়। ছেলেদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। নানাবিধ যৌন বিকার, নারীর উপর যৌন-নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনের কারণ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই সেক্সুয়াল নার্সিসিজ্‌ম দায়ী বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। 

এই রোগের কবল থেকে বাঁচার উপায় কী? 
এ ব্যাপারে প্রথমেই বলতে হয় যে, এটি নিজে নিজে সারানো বেশ মুশকিল। প্রথমত, এটা অনেকগুলো আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সমম্বয়ে সৃষ্ট এক ধরণের জটিল সমস্যা, যা হুট করে বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে দূর করা সম্ভব নয়, যেখানে ধূমপানের মতো অভ্যাসকে ত্যাগ করাটাই অসম্ভব মনে হয় ধূমপায়ীর কাছে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ সম্পর্কিত সচেতনতার মানে এই নয় যে তিনি বুঝে গেছেন করণীয় কী, কারণ রোগের ধরণ অনুযায়ী প্রতিকারের উপায় সচেতনতা দিয়ে জানা সম্ভব নয়—এজন্য দরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পেশাদারী অভিজ্ঞতা। সেজন্য  একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট/থেরাপিস্ট-এর বিকল্প খুঁজতে যাওয়া অনর্থক। 
সংকলিত 

ফেসবুকে লাইক দিন https://www.facebook.com/Psychobd

No comments:

Post a comment