Sunday 1 August 2021

বিরল রোগ উইলসন

উইলসন রোগ হলো এক ধরনের বিরল প্রকৃতির জিনগত ব্যাধি, যা শরীরে তামার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। মূলত মা-বাবার থেকেই সন্তানরা এই রোগ পেয়ে থাকে। এ রোগ তামাকে লিভার থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে পরিবহন করতে সহায়তা করে।


এ ছাড়া এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে তামা শরীরের অতিরিক্ত জমা তামার দিকে পরিচালিত করে। ফলে জমা হওয়া তামাগুলো বিষাক্ত রূপ নেয় এবং শরীরের ক্ষতি করতে শুরু করে

উইলসন রোগের লক্ষণ :
উইলসন রোগ দেখা দিলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলি মূলত মস্তিষ্ক এবং লিভারের সাথে সম্পর্কিত হয়।



লিভার সম্পর্কিত লক্ষণ গুলি হল –
১) বমি বমি ভাব
২) দুর্বলতা
৩) পেটে অতিরিক্ত জল জমা
৪) পা ফোলা
৫) ফ্যাকাশে ত্বক
৬) চুলকানি।

মস্তিষ্ক সম্পর্কিত লক্ষণ গুলি হল –
১) কম্পন
২) পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
৩) কথা বলতে সমস্যা হয়
৪) ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন হয়
৫) উদ্বেগ
৬) শ্রবণ ও দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।

উইলসন রোগের কারণ :
১) উইলসন রোগটি মূলত এ টি পি সেভেন বি জিনে পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে।

২) এই জিনটি তামা পরিবহনের এ টি পি এস ২ নামে একটি প্রোটিন গঠনের নির্দেশ দেয়। তামাকে লিভার থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে পরিবহন করতে সহায়তা করে।

৩) এছাড়াও এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে তামা অপসারণ করতে এ টি পি এস টু নামে একটি প্রোটিন হিসেবেও কাজ করে।

৪) এর পাশাপাশি যখন এ টি পি ৭ বি জিনে পরিবর্তন হয় তখন এটি তামা পরিবহন প্রোটিন গুলির কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে। যা দেহে অতিরিক্ত তামা এবং শরীরের অতিরিক্ত জমা তামার দিকে পরিচালিত করে। ফলস্বরূপ জমা হওয়া তামা গুলি বিষাক্ত রূপ নেয় এবং শরীরের ক্ষতি করতে শুরু করে।

উইলসন রোগের জন্য চিকিৎসা :
ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি উইলসন রোগ হল একটি জিনগত ব্যাধি। এর সঠিক চিকিৎসা নেই। তবে সময় মত কিছু থেরাপির মাধ্যমে এর জটিলতা কম করা যায় এবং বেড়ে যাওয়াকে আটকানো যায়। এমন কয়েকটি চিকিৎসা পদ্ধতি হলো –

১) কপার থেরাপি – এই থেরাপির মাধ্যমে শরীর থেকে তামার পরিমাণ কম করা হয়। এটির জন্য চিকিৎসকেরা বেশ কিছু ওষুধ লিখে দেন এর পাশাপাশি পেনিসিলামাইন, ট্রায়েন্টাইন এবং জিঙ্ক অ্যাসিটেট সহ বিভিন্ন ওষুধগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। তবে মাথায় রাখবেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনই এই সমস্ত ওষুধ গ্রহণ করবেন না।

২) ভিটামিন-ই পরিপূরক – উইলসন রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিটামিন ই পরিপূরক দেওয়া যেতে পারে।

৩) কম তামা গ্রহন – খাদ্য তালিকায় তামা সমৃদ্ধ খাদ্য কম রাখার পরামর্শ দেন চিকিত্সকেরা। তাই সেই মতো খাদ্যতালিকা তৈরী করতে হবে।

৪) লিভার ট্রান্সপ্লান্ট – উইলসন রোগের কারণে যদি লিভারের ক্ষতি মারাত্মক হয় তাহলে লিভার প্রতিস্থাপন এর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে সম্পূর্ণটাই লিভারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

উইলসন রোগের জন্য খাদ্য তালিকা :
যে সমস্ত রোগীরা উইলসন রোগের সমস্যায় ভুগছেন তাদেরকে কম তামা সমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। এমনই কিছু খাবার সম্পর্কে জানুন যেগুলি তামা সমৃদ্ধ। সেগুলি হল –
১) যেকোনো দুগ্ধজাত পণ্য (যেমন দুধ, দই)
২) প্রোটিন জাতীয় খাদ্য
৩) দস্তা সমৃদ্ধ খাবার, যা দেহে তামার শোষনকে বাধা দিতে পারে।
৪) তবে সমস্যার তীব্রতা অনুযায়ী পুষ্টিবিশেষজ্ঞের কাছ থেকে খাদ্য তালিকা তৈরি করে নেওয়া উচিত।

রোগীদের যে সমস্ত খাবারগুলি এড়িয়ে চলা উচিত, সেগুলি হল –

১) মাশরুম
২) চকলেট
৩) যে কোন বাদাম
৪) শুষ্ক ফল
৫) মাংসের লিভার

উইলসন রোগ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ** এবং উত্তর ***

**উইলসন রোগ নিয়ে কতদিন বেঁচে থাকা যায়?

***যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ তাই এটি যদি কারো হয় সেটা সারাজীবন থাকতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং যথাযথ খাদ্য অনুসরণ করলে এই রোগের জটিলতা এড়ানো যায় কিংবা কম করা যায়।

**উইলসন রোগে কি অ্যালকোহল পান করা যায়?

***অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়াও অ্যালকোহল এই উইলসন রোগের প্রকোপ কে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই যাদের উইলসন রোগ রয়েছে তাদের অ্যালকোহল না খাওয়াই ভালো।

**কিভাবে উইলসন রোগ মস্তিষ্কে আঘাত করে?

***উইলসন রোগের ফলে কথা বলতে অসুবিধা, ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন এবং উদ্বেগের মত মস্তিষ্কের সমস্যা গুলি দেখা দেয়।

**কত বছর বয়সে উইলসন রোগ ধরা পড়ে?

***জন্ম থেকেই এই উইলসন রোগের উপস্থিতি থাকতে পারে। তবে লক্ষণগুলো ৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে প্রকট হতে শুরু করে।

**উইলসন রোগ দেখা দিলে কি হয়?

***উইলসন রোগের কারণে শরীরের তামার আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও এটি লিভার এবং মস্তিষ্কে সমস্যার সৃষ্টি করে। 

No comments:

Post a Comment