Thursday, 5 December 2013

প্যানিক ডিজঅর্ডার

"আমার হার্ট অনেক দুর্বল। মাঝে মধ্যেই আমার হার্টবিট অনেক বেড়ে যায়। মানে বুকে ধড়ফড় শুরু হয় আরকি। মনে হয় নিজের উপর আর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, মাথা ঘুরে পড়ে যাবো। সারা শরীর কাঁপতে থাকে। প্রচুর ঘাম হয়। বুকের ভেতর কেমন যেন লাগে। দম বন্ধ হয়ে যায়, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মনে হয় এখনি মরে যাবো। হার্টের অনেক ভালো ভালো ডাক্তার দেখিয়েছি। কেউ কিছু ধরতে পারে নাই। মানসিক রোগের এখানে কেন যে পাঠালো আমি তো বুঝতে পারছিনা। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি?"

আপনি যদি এই ধরনের লক্ষণ নিয়ে সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে রেফার হয়ে
আসেন তাহলে আপনার মনে এই প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। শুধু আপনিই নন এই সমস্যার বেশীরভাগ ক্লায়েন্টই কার্ডিয়াক ডিপার্টমেন্ট থেকে, অনেকেই এই প্রচুর টেস্ট করান, এক ডাক্তার থেকে আরেক ডাক্তারের কাছে ঘুরে বেড়ান। কারণ হার্টবিট এতো তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়াকে অনেকেই ভয় পেয়ে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বলে মনে করেন। ডাক্তার যখন বলেন, " আপনার হার্ট সুস্থ আছে, কিছু হয়নি, তখন ক্লায়েন্ট মনে করেন ডাক্তার তার রোগ ধরতে পারেনি। আসলে আপনি যে লক্ষণগুলোকে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বলে ভাবছেন তা প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ। আর প্যানিক অ্যাটাক যদি অপ্রত্যাশিতভাবে হয় কোনরকম কারণ ছাড়াই এবং ব্যাক্তির ভিতরে যদি অতিরিক্ত ভয় তৈরি হয় আবার এই রকম অ্যাটাকের মুখোমুখি হবার, যার ফলে ব্যাক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকীর সম্মুখীন হয় তাকে প্যানিক ডিসঅর্ডার বলে। প্যানিক ডিসঅর্ডার একটি মানসিক রোগ। সে কারণেই আপনাকে সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে রেফার করা হয়েছে। আর সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্টে আসা মানেই পাগল হয়ে যাওয়া নয়। মন ও মস্তিস্কের অধিকারী হলে মানসিক বিভাগে কখনো কখনো ঢুঁ মারাটা স্বাভাবিক।

কি? নিজেকে বোকার মতো মনে হচ্ছে? ভুল কিন্তু আপনার নয়। অনেক সময় ডাক্তারদেরও সময় লাগে লক্ষণগুলো শারীরিক না মানসিক বোঝার জন্য। সুতরাং আপনি বিভ্রান্ত হতেই পারেন। কিন্তু লক্ষণগুলো যে মানসিক হতে পারে যখন আপনি স্বীকার করে নেবেন তখনই আপনার সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

 প্যানিক ডিসঅর্ডারে অনেক সময়ে ব্যাক্তি প্যানিক অ্যাটাকের ভয়ে বাড়ির বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেয় বা মানুষজনের ভীড় এড়িয়ে চলে, একে বলা হয় প্যানিক ডিসঅর্ডার উইথ অ্যাগোরাফোবিয়া। এই মানসিক রোগটি সাইকোথেরাপীতে অনেক ভালো কাজ করে। 



যেভাবে বুঝবেন যে প্যানিক ডিজঅর্ডার রোগে ভুগছেন
* হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট হওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা।
* দম বন্ধ হয়ে আসা, হাঁপানি রোগীর মতো বড় বড় করে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া।
* হাত-পা অবশ হয়ে আসা। শরীরে কাঁপুনি হওয়া।
* বুকের মধ্যে চাপ লাগা এবং ব্যথা অনুভব করা।
* এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো রোগী বলেন হঠাৎ পেটের মধ্যে একটা মোচড় দেয়, তারপর বুক ধড়ফড় শুরু হয়, সঙ্গে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আর কথা বলতে পারেন না।
* বমি বমি ভাব। পেটে অস্বস্তিবোধ ও গলা শুকিয়ে আসা।
* পেটে গ্যাস হয় এবং বুকে চাপ বোধ।
* দুশ্চিন্তা থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে। কোনো কোনো রোগী বুকে ব্যথা ও হাত-পায়ের ঝিমঝিমকে হার্টঅ্যাটাকের লক্ষণ মনে করে প্রায়ই ছুটে যান হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে।
* মৃত্যুভয় দেখা দেয়, মনে হয় এখনই মরে যাবেন রোগ যন্ত্রণায়।
* নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
* বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া/ইসিজি করানো।
* দূরে কোথাও গেলে স্বজনদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া, পথে অসুস্থ হলে সাহায্যের দরকার পড়ে
নামাজ পড়তে গেলে একপাশে দাঁড়ান, যেন অসুস্থ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসা যায়।
* রোগীদের মধ্যে ভয় কাজ করে এই বুঝি আবার একটি অ্যাটাক হতে পারে।
* রোগের লক্ষণগুলো হঠাৎ শুরু হয়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট পর কমে যায়।
* সেফটি বিহেভিয়ার- যেমন অ্যাটাকের সময় বসে পড়া, কোনো কিছু হাত দিয়ে ধরে সাপোর্ট নেয়া ইত্যাদি লক্ষণ রোগীর মাঝে দেখা দেয়। যা কি না হৃদরোগীদের মধ্যে লক্ষণীয় নয়।
* অন্য রোগের মধ্যেও প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে বিষণ্নতায় দীর্ঘদিন ভুগলে।
* শুচিবায়ু নামক রোগেও এই রকম প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে।
* নিছক সামাজিক ভয়ে।
* নেশা ছাড়ার পর।
অন্যান্য কারণ
* জিনগত কারণ যেমন আত্মীয়ের মধ্যে প্যানিক ডিজঅর্ডার থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
* শরীরে অদ্ভুত, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণের (সেরোটনিন গাবা ও নরএডরেনালিন) রোগটি দেখা দিতে পারে।
* যাদের হার্টের ভাল্বের সমস্যা আছে তাদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
যেসব পরিণতি হতে পারে
* সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে এ ধরনের রোগী ডাক্তারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সর্বস্বান্ত হন এবং সব শেষে নিজেই হার্টের রোগী বলে কাজকর্ম ছেড়ে দেন।
* বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন।
* নেশায় জড়িয়ে যেতে পারেন।
* এগোরেফোবিয়া নামক আরও একটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। তখন রোগী বাইরে বের হওয়া, হাটবাজার, রেস্টুরেন্ট ও ক্যান্টিন ইত্যাদি জায়গায় যেতেও ভয় পান।
* ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
* আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে।
* সর্বোপরি এই মানুষটি তার সমস্যার কারণে পরিবার, সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে যেতে পারেন।
চিকিৎসা
নিয়মিত ওষুধ সেবন করা। রোগীকে আশ্বাস দিতে হবে। মনোরোগের চিকিৎসার জন্য মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সঠিক সময়ে সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে চিকিৎসা করালে এসব রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।

5 comments:

  1. আমিও ভুগতাছি Medicin: Andep 50mg 2-1-0 Mirzalux 15mg 0-0/1-2

    ReplyDelete
  2. আমি প্রায় ৮ মাস ধরে এই সমস্যা গুলোতে ভুগছি। প্লিজ আমাকে একটু বলেন কিভাবে এ থেকে মুক্তি পাব? কোন কাজেই মন বসাতে পারছি না। বাসার সবাই ভাবছে আমি কাজের ভয়ে এমন করছি।

    আমার ফেইসবুক আইডিতে আমাকে জনান ভাই। আমার আইডি saidus saqlain saikat

    ReplyDelete
  3. Vai apnar sathe aktu kotha boltam... Ami 1 yr dhore panic disorder a vugsi..amar facebook id methun adhikary ovi.. Mobile 01952414250

    ReplyDelete
  4. সাইকিয়াট্টি দেখাচ্ছি নয় বছর ধরে। স্থায়ী সমাধান পেলাম না। স্থায়ী সমাধানের উপায় কী?

    ReplyDelete
  5. ১২-১৩ বছর আগে আমার এক মামা একসিডেন্ট করে মারা যায়।সেদিন রাতে উনাকে দেখে আমি প্রচুর ভয় পাই।এবং সকে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার শরিলে তীব্র জ্বর, ও বুকে ব্যাথা।
    তারপর থেকে আমার রোগ হলেই সুস্থ হতে অনেক সময় লাগতো।কোথায় স্থর থাকতে পারতাম না। ছোট পট করতাম।তারপর অনেকদিন শুস্থ থাকার পরে ২০১৭ সালে আমার টাইফয়েড রোগ হয় এবং তখন আমার আবার এই সমস্যা গুলো হয়।বিভিন্ন রকমের ডাক্তার দেখাই বিভিন্নধরনের পরিক্ষা করাই কোন রোগ ধরা পরেনা। একটা সময় সব কিছু বাদ দিয়ে কাজে লেগে পরলাম। কাজ কাম করতে করতে ধীরে ধিরে আমার সমস্যা গুলো চলে গেলো।গত লক ডাউনে বাড়িতে গেলাম। তেমন কাজ কাম নেই। তখন থেকে আমার এই সমস্যা গুলো শুরু হয়েছে।আমার সুধু মনে হয় আমি বেশিদিন বাচবো না।আমার মনে হয় বড় কোনো রোগ হইছে,প্রায় সময় শ্বাস কস্ট হয়।মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই বুঝি মারা যাবো।এই ব্জঝজ স্ট্রক করবো।আর অল্পতেই ভয় পেয়ে উঠি। কিছুর শব্দ শুনলেও ভয় পেয়ে উঠি।আমার খুব খারাপ লাগে।এইসব জিনিস আমি কাউকে শেয়ার করতে পারছি না।কি করবো কোথাও যাবো তাও বুজতেছি না।কোন ডাক্তার দেখাবো তাও বুজতেছি না। প্লিজ দোয়া করে একটু হেল্প করুন।

    ReplyDelete